স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ায় দুগ্ধ শিশুসহ কারাগারে!

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ এএম

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের কামিতার পাড়া গ্রামের নিহত মোহাম্মদ কাশেম ও অভিযুক্ত মোহাম্মদ রাসেল মামাতো-ফুফাতো ভাই। দুজনেই পেশায় ছিলেন জেলে। সাগরে যাওয়ার জন্য ট্রলার মালিকের কাছে অগ্রিম টাকা চান রাসেল। কিন্তু এর আগেও টাকা নিয়ে মাছ ধরতে না যাওয়ায় মালিক তাকে টাকা দিতে অপারগতা জানান। মালিক বলেন, তোর ভাই কাশেম জিম্মাদার হলে তোকে (রাসেল) আমি টাকা দেব। কিন্তু রাসেল টাকার জন্য কাশেমকে জিম্মাদার হতে বললে কাশেম রাজি হননি। এ নিয়ে ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল কুতুবজুমের কবির বাজারে দুই ভাইয়ের বাগ্বিত-া হয়। এর জের ধরে সকাল ১০টায় সেই বাজার থেকে রাসেল ও তার ভাগিনা শাহেদ খান এবং রাসেলের দুলাভাই আবদুল গফুরসহ ১০-১২ জন কাশেমকে ধাওয়া করে এনে প্রায় ৩০০ মিটার দূরের কামিতার পাড়া গ্রামের নিহত কাশেমের বসতবাড়ির দরজার সামনে কুপিয়ে হত্যা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে উত্তেজিত এলাকাবাসী সেদিন বিকেলেই অভিযুক্ত রাসেলের বাড়িতে হামলা ও  ভাঙচুর চালায়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর দিন ২৪ এপ্রিল নিহত কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৩২) বাদী হয়ে স্বামী হত্যার দায়ে  রাসেলসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। আর এ মামলা দায়েরই ফাতেমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

এই হত্যা মামলার জের ধরে ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট  আসামি রাসেলের মা নুর জাহান বাদী হয়ে মহেশখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিহত কাশেমের পরিবারের ৭ সদস্যের বিরুদ্ধে নালিশি দরখাস্ত দায়ের করেন।

বাদীর নালিশি দরখাস্তমতে, নিহত কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম, মা, তিন ভাই, মামা ও ছোট বোনসহ মোট ৭ জন মিলে ২৪ মে সকাল ৮টায় আসামি রাসেলের মায়ের বসতঘর ভাঙচুর, হামলা ও লুটপাট  চালায়। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে মহেশখালী থানাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। মামলাটির তদন্ত করেন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোজাহেরুল ইসলাম। তিনি ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন মর্মে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।  আদালত  প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এই পরোয়ানামূলে গত ১ সেপ্টেম্বর দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ নিহত কাশেমের স্ত্রী ফাতেমাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এই বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তার তদন্ত নিয়ে সমালোচনা চলছে। এমনকি আইনজীবীরা এই প্রতিবেদনকে পুলিশের তামাশা বলে মন্তব্য করছেন।

এদিকে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তদন্ত কর্মকর্তা বাদীর দেওয়া সাতজন সাক্ষীর বাইরে আর কারও সাক্ষ্য নেননি। এমনকি প্রতিবেদনে সাত সাক্ষীর সাক্ষ্যের জবানবন্দিতে দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনসহ বক্তব্য একই। তবে আদালতে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে থাকা তিনজন সাক্ষী মোজাহের মিয়ার স্ত্রী নুর নাহার, মোহছেন আলীর স্ত্রী মুন্নি আক্তার ও নূর হোসেনের স্ত্রী মোতাহেরা বেগম পুলিশকে কোনো ধরনের জবানবন্দি প্রদান করেননি এবং কোনো কাগজে স্বাক্ষর করেননি বলে দাবি করেছেন।

প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ আলামত জব্দের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আদালতে তিনি মামলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ  ঘটনাস্থলের খসড়া মানচিত্র প্রদান করেনি। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনে চুরি হওয়া হিসেবে উল্লেথ থাকা স্মার্ট কার্ড, পাসপোর্টসহ কোনো ধরনের আলামত তিনি আদালতে দাখিল করতে পারেননি।

এ ছাড়া মামলার ঘটনাটি প্রকাশ্যে ও গোপনীয়ভাবে তদন্ত করার পাশাপাশি  তিনি গুপ্তচর নিয়োগ করে ঘটনার সত্যতা যাচাই করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন।

তবে তদন্ত কর্মকর্তা মোজাহেরুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলেন, আদালতে দেওয়া অভিযোগের তদন্ত করার ক্ষেত্রে বাদীর দেওয়া সাক্ষীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই তাদের বাইরে আর কারও সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি।

২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটিই তদন্তে দেখা হয়েছে এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে ‘২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল বাদিনীর বাড়ির পার্শ্ব  স্থানে একটি হত্যাকা- সংঘটিত হয়। ওই বাদীপক্ষ মামলা করার সময় বাদিনীর ছেলে মোহাম্মদ রাসেলকে অন্যায়ভাবে হত্যা মামলার আসামি করে।’ এমন লেখার  জবাবে এসআই মোজাহেরুল ইসলাম বলেন, ‘এ রকম লেখার কোনো সুযোগ নেই, আগের ঘটনা, তাই আমার মনে পড়ছে না।’ এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাসেলসহ ১০ জনকে অভিযুক্ত করে কাশেম হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহেশখালী থানার এসআই সাইফুল ইসলাম।

সরেজমিন কামিতার পাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়,  মাটির দেয়াল ও টিনের চাল দিয়ে তৈরি তিন কক্ষের ছোট্ট একটি ঘর। এই বাড়িতেই তিন সন্তান ও শাশুড়ির সঙ্গে থাকতেন ফাতেমা।

বিধবা ফাতেমার দুই মেয়ে রাজমিন আকতার (৯) ও মিশকাত জান্নাত (৫) কুতুবজোমের তাজিয়াকাটা সুমাইয়া (রা.) এতিমখানায় থাকে। মাকে কাছে না পেয়ে কান্নাকাটি করছে অবুঝ দুই বোন।

এদিকে ফাতেমা বেগমের বিরুদ্ধে করা মামলার তিন সাক্ষী নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের সঙ্গে ওই গ্রামেই দেখা হয় প্রতিবেদকের। তারা জানান, ফাতেমা বেগমের বিরুদ্ধে করা মামলায় তারা কোনো সাক্ষ্য দেননি। এমনকি সাক্ষীদের তালিকায় তাদের নাম কীভাবে এসেছে, সেটিও তারা জানেন না।

২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না জানতে চাইলে তারা বলেন, ওইদিন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাদের দাবি, মামলায় যে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো ২৩ এপ্রিল মোহাম্মদ কাশেম হত্যার দিন উত্তেজিত এলাকাবাসী ভেঙে ফেলেছিল। এতে কাশেমের পরিবারের কেউ জড়িত ছিলেন না।

এ বিষয়ে কামিতার পাড়ার বাসিন্দা মিজানুর রহমান, আয়েশা বেগম, মমতাজ বেগমসহ একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তারাও দাবি করেন, ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

তাদের ভাষ্য, কাশেমকে হত্যার পর তার পরিবারকে চাপে ফেলতে এবং প্রতিশোধ নিতে পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে।

নিহত কাশেমের মা রাশেদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে হত্যা করে আমাদের বিরুদ্ধেই উল্টো মিথ্যা মামলা করেছে। আমরা জানতেই পারিনি যে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, পুলিশ তদন্ত করেছে এবং ওয়ারেন্ট হয়েছে। এখন আমার পুত্রবধূকে কারাগারে পাঠিয়ে আসামিরা আমাদের হুমকি দিচ্ছে।’

কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাহমুদুল হক বলেন, ‘২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেনি। কারও ঘরবাড়ি ভাঙচুরও করা হয়নি। কাশেমকে হত্যার পর তার পরিবারকে দুর্বল করতে তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়েছে। সেই মামলায় দেড় বছরের শিশুসহ ফাতেমা এখন কারাগারে। আর বাড়িতে ছোট ছোট দুটি শিশু মাকে ছাড়া রয়েছে।’

কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শেখ কামাল বলেন, ঘটনা জানার পর তিনি ইউপি সদস্যকে এলাকায় পাঠিয়েছিলেন। তার কাছে জানতে পারেন, নিহত কাশেম ও অভিযুক্ত রাসেল আত্মীয়। সামান্য টাকার বিষয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এর একপর্যায়ে দলবদ্ধভাবে কবির বাজার থেকে দৌড়ানি দিয়ে ঘরের দরজার সামনে কাশেমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। চেয়ারম্যানের ভাষ্য, এ সময় নিহতের পরিবার শোক পালন করছিলেন।  হত্যার দিনেই উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত রাসেলের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আসামিপক্ষ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। আর সেই মামলা নিয়েই পুলিশ মনের মাধুরী মিশিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে।

নুরজাহানের মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা মহেশখালী থানার ওসি (তদন্ত) প্রতুল কুমার শীল বলেন, এই মামলার বিস্তারিত তার মনে নেই। তিনি জেনে পরে জানাবেন। আর সব সাক্ষীর জবানবন্দি যদি একই হয়, আদালতের দৃষ্টিগোচর হলে আদালত তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

কক্সবাজারের দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী ইউসুফ আরমান বলেন, পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে এটি একটি অসঙ্গতিপূর্ণ প্রতিবেদন। যেখানে ঘটনাস্থলের মানচিত্র নেই, আলামত উদ্ধার নেই, নিরপেক্ষ কোনো সাক্ষী নেই। অথচ তদন্তের জন্য কর্মকর্তার অবাধ ক্ষমতা রয়েছে।

কক্সবাজার আইন কলেজের শিক্ষক আইনজীবী সেজান এহেছান বলেন, মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য পুলিশ অভিযোগকারীর দেখানো সাক্ষী ছাড়া অন্যদের সাক্ষ্য নিতে পারেন। মহেশখালী  উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, এই পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনি সহযোগিতা দেওয়া হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত