‘সঙ্গী যারা ছিল ঘিরে তারা সবে নামগোত্রহীন,
কাড়িতে জানে না তারা পথিকের আঁখি উদাসীন।
ভরিল আমার চিত্ত বিস্ময়ের গভীর আনন্দ,
চিনিলাম তোমারে আকন্দ।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আকন্দ : পূরবী
আকন্দ ফুল নিয়ে হিন্দু পুরাণে বেশ কিছু কাহিনি আছে। দেবতা ও অসুররা একবার সমুদ্র মন্থন করেছিলেন। মন্থনের সময় সে সমুদ্র থেকে হলাহল বিষ উঠে আসে। শিব তখন বিশ্বকে সেই তীব্র বিষের বিষাক্ততা থেকে রক্ষা করার জন্য সব বিষ নিজেই পান করে হয়েছিলেন নীলকণ্ঠ। বিষের সেই প্রচন্ড উত্তাপ ও তীব্রতা শান্ত করার জন্য শিবের মাথায় জল, বেলপাতা, ধুতুরা ও আকন্দ ফুল অর্পণ করেছিলেন দেবতারা। ধুতুরা ও আকন্দ দুটোই বিষাক্ত উদ্ভিদ। এগুলো শিবের বিষের তীব্রতা শোষণ করেছিল। তাই আকন্দ ফুল শিবের এত প্রিয়। শিবপূজায় আকন্দ ফুল লাগবেই। ভক্তরা আকন্দ ফুলের পাঁচটি পাপড়িতে শিবের পঞ্চানন রূপকে দেখতে পান, পাপড়ির নীলাভ বেগুনি রঙে যেন সেই বিষের তীব্রতা এখনো মেখে আছে।
মাঝে মাঝেই সকালবেলা রমনা উদ্যানে গিয়ে নার্সারির ভেতরে বড় আকন্দ গাছটার দিকে তাকাই আর দেখি ফুল ফুটেছে কি না। প্রায়ই গাছটি হতাশ করে না। ডালের মাথায় কয়েকটা ফুলে থোকা নিয়ে বাতাসে দুলে দুলে সে যেন আমাকে অভিবাদন জানায়। আলতো করে কাছে গিয়ে পাতায় হাত বুলাই। সাদাটে মোমের মতো আবরণে ঢাকা স্নিগ্ধ শোভাময়ী বড় বড় ডিম্বাকার পুরু পাতাগুলো ছোটবেলার অনেক স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। খেলতে গিয়ে পড়ে ব্যথা পেলে রাতে হ্যারিকেনের ওপর আকন্দ পাতায় সরষের তেল মেখে সে পাতা গরম করে ব্যথা জায়গায় সেঁক দিতাম। তাতে উপশম হতো। মনে হতো, আকন্দ পাতা যেন দেহের সেই বিষব্যথা নিজে শুষে নিয়েছে। পাড়ার অনেক দিদিকে দেখতাম, মুখে ব্রণ হলে ব্রণের ওপর আকন্দের পাতা দিয়ে ঢেকে টিপে বসে থাকতে। তাতে নাকি ব্রণ ফেটে যেত। পরে সে কথার সত্যতা পেয়েছি অথর্ববেদেও। মৌমাছি বা বিষের দংশন যে না খেয়েছে সে বুঝবে না যে, সে বিষের জ্বালা কতখানি! দংশিত স্থানে আকন্দর পাতা ভাঙলে যে সাদা দুধের মতো কষ ঝরে তা লাগালে সে বিষজ্বালার উপশম হয় বলে শিবকালী ভট্টাচার্য তার ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’ বইয়ের দ্বিতীয় খন্ডে লিখেছেন।
এত যার গুণ, নিজে বিষাক্ত গাছ হয়েও মানুষের বিষ নাশ করে, অথচ সে গাছটির কদর আমরাই হয়তো বুঝিনি, এমনকি চিনতেও পারিনি। অথচ গাছটি এ দেশের কোথায় না আছে? সুন্দরবনের একেবারে সাগরতীরে কটকার বেলাভূমিতে কি চমৎকার কয়েকটা শ্বেত আকন্দের বড় ঝোপ যে দেখেছিলাম! খুলনার দৌলতপুরে ব্রজলাল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের দধিবামনদেব মন্দির প্রাঙ্গণে সেই শ্বেত আকন্দের একটি বয়স্ক গাছ রয়েছে। গত বৈশাখে সে গাছের কাছে গিয়ে তার ফুল, ফল ও বীজের দেখা পেলাম। কুলি পিঠার মতো ফাঁপা ফল, ফেটে তার ভেতর থেকে কি চমৎকার রেশমি সুতোর মতো তন্তুময় হালকা বীজ বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে! ওসব বীজ যেখানেই পড়বে, সেখানে মাটিতে রস থাকলে গজিয়ে চারা তৈরি করবে। বাতাসই ওর বাহক। আকন্দ পাতারই শুধু গুণ দেখলাম? এর শিকড়, আঠা ও ফুলও কম ঔষধি গুণের না। তা ছাড়া এর ফুল যে কত মৌমাছিদের মধু খাওয়ায়! সে কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও জানতেন। তাই তো তিনি ১০১ বছর আগে একটি কবিতায় সে কথা লিখে রেখেছেন ‘দেবতার প্রিয় তুমি, গুপ্ত রাখ গৌরব তোমার-/ শান্ত তুমি, তৃপ্ত তুমি, অনাদরে তোমার বিহার।/ জেনেছি তোমারে, তাই জানাতে রচিনু এই ছন্দ/ মৌমাছির বন্ধু হে আকন্দ!’
এ দেশে দু রকমের আকন্দ গাছ আছে আকন্দ ও শে^ত আকন্দ। আকন্দ ফুলের রঙ লালচে বা নীলচে বেগুনি আভাযুক্ত সাদা, শ্বেত আকন্দের ফুল সাদা। আকন্দের ইংরেজি নাম জায়ান্ট মিল্কউইড। এ গাছের ডালপাতা ভাঙলে সাদা দুধের মতো কষ ঝরে বলে হয়তো এরূপ নাম রাখা হয়েছে। আকন্দের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Calotropis gigantea ও গোত্র অ্যাপোসাইনেসি।
আকন্দ একটি বৃহৎ গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ, চিরসবুজ। উদ্ভিদ ৪ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, ছড়ানো ডালপালা, গোড়া কিছুটা কাষ্ঠল। পাতা ডিম্বাকার বা ডিম্বাকার-আয়তাকার, পুরু বা মাংসল, পাশর্^ শিরা ৬-৭ জোড়া, রঙ ধূসর সবুজ। ডালের আগায় বা ডালে পাতার কোল থেকে পাশর্^ীয়ভাবে ছাতার মতো রেসিম পুষ্পমঞ্জরিতে কয়েকটা ফুল তোড়ার মতো ফোটে। ফুলের পাপড়ি পাঁচটি, পুরু, শক্ত, বেগুনি বা নীল আভাযুক্ত সাদা, মোমের মতো। কেন্দ্রস্থলে পুরুষ কেশরগুচ্ছ থাকে। একজোড়া ফলিকুল বিশিষ্ট ফাঁপা ফলের ভেতরে তুলার আঁশের মতো আঁশযুক্ত বীজ থাকে, বীজ ক্ষুদ্র ও বাদামি। ফুল-ফল ধরার সময় নভেম্বর থেকে এপ্রিল।
লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ