জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি দানের বিধান পুনর্বিবেচনা জরুরি: মামুনুল হক

আইনটির পক্ষে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, এতে ইসলামী বিধান সম্পর্কে তার অজ্ঞতা কিংবা অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে। তার দাবি, হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের মৌলিক পার্থক্য যথাযথভাবে অনুধাবন না করে মুসলিম পারিবারিক আইনসংক্রান্ত বিধান প্রণয়ন গ্রহণযোগ্য নয়।

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪২ পিএম

জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন বিধান শরিয়াহর আলোকে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬ গতকাল রোববার সংসদে পাস হয়েছে। তড়িঘড়ি করে আইনটি পাস করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের এই নতুন বিধান শরিয়াহর আলোকে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।

মামুনুল হক বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে সেই নিরাপত্তার নামে এমন কোনো বিধান করা উচিত নয়, যা আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের শরয়ী বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি করে। তার মতে, জীবিত অবস্থায় হেবা এবং মৃত্যুর পর ফারায়েজ অনুযায়ী উত্তরাধিকার—দুটি পৃথক বিষয়। নতুন আইন যেন কোনো ওয়ারিশকে শরিয়াহ নির্ধারিত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ইসলামে হেবা শুধু কাগজে-কলমে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার বিষয় নয়; এর নিজস্ব শরিয়া কাঠামো রয়েছে। হানাফি ফিকহে ইজাব, কবুল ও কবয হেবার মৌলিক বিষয়। গ্রহীতার বাস্তব দখল ও কর্তৃত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নতুন আইনে মালিকানা হস্তান্তরের কথা বলা হলেও দাতার জীবদ্দশা পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহার তার কাছেই রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত হস্তান্তর ও কবয কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

হেবা ও সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের বিষয়ে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনার কথাও বিবৃতিতে তুলে ধরেন মামুনুল হক। নু‘মান ইবনে বশীর (রা.)-এর বর্ণনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার পিতা তাকে বিশেষ একটি দান করলে মহানবী (সা.) জানতে চান, অন্য সন্তানদেরও অনুরূপ দেওয়া হয়েছে কি না। না দেওয়া হলে তিনি বলেন, 'আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।' পরে নু‘মানের পিতা সেই দান ফিরিয়ে নেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনাটি সহিহ বুখারিতে বর্ণিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর তা ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও মহানবী (সা.) সতর্ক করেছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেন মামুনুল হক। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তার হেবা ফিরিয়ে নেয়, সে ওই কুকুরের মতো, যে নিজের বমি পুনরায় খায়।' এটিও সহিহ বুখারিতে বর্ণিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মামুনুল হকের ভাষ্য, হেবা ইসলামী শরিয়াহর একটি স্বতন্ত্র বিধান এবং এর মালিকানা, কবয, দখল ও প্রত্যাহারের বিষয়ে শরিয়াহর সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। তার অভিযোগ, নতুন আইনের মধ্যে ইসলামের হেবা ও ফারায়েজের বিধানকে অবজ্ঞা করার দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে।

আইনটির পক্ষে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এতে ইসলামী বিধান সম্পর্কে তার অজ্ঞতা কিংবা অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে। তার দাবি, হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের মৌলিক পার্থক্য যথাযথভাবে অনুধাবন না করে মুসলিম পারিবারিক আইনসংক্রান্ত বিধান প্রণয়ন গ্রহণযোগ্য নয়।

সরকারের পক্ষ থেকে নতুন বিধান সাধারণ হেবা বা মুসলিম আইনের হেবাকে প্রভাবিত করবে না—এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে মামুনুল হক প্রশ্ন করেন, বাস্তবে এই আইন হেবার শরিয়া কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে সম্পত্তির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের নতুন ব্যবস্থা তৈরি করছে কি না। বিশেষ করে দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় ভোগ ও নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রেখে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে সম্পত্তি হস্তান্তর করলে প্রকৃত কবয, পূর্ণ মালিকানা ও হস্তান্তরের চূড়ান্ততা নিয়ে শরিয়া প্রশ্ন সৃষ্টি হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, এই আইনের অন্যতম উদ্বেগ হলো—হেবার নামে যেন আল্লাহ নির্ধারিত ফারায়েজকে পাশ কাটিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ওয়ারিশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি না হয়। তার মতে, জীবদ্দশায় কোনো ব্যক্তি সম্পত্তি নির্দিষ্ট একজন উত্তরাধিকারীর নামে এমনভাবে হস্তান্তর করলে যাতে মৃত্যুর পর অন্য ওয়ারিশরা কার্যত বঞ্চিত হন, তাহলে তা ইসলামের উত্তরাধিকার ব্যবস্থার ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংসদে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি ওঠার পরও বিলটি দ্রুত পাস করা হয়েছে উল্লেখ করে মামুনুল হক বলেন, এতে জনমনে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের মতো গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত আইন প্রণয়নের আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, মুফতি, ফকীহ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিবৃতিতে বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মামুনুল হক। তিনি বলেন, বিএনপি ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সমুন্নত রাখা এবং মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামবিরোধী কোনো আইন না করার অঙ্গীকারের কথাও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, ইসলামের হেবা ও ফারায়েজের মতো সুস্পষ্ট শরিয়াহ বিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আইন এত দ্রুত পাস করা হলো কেন?

মামুনুল হক ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬-এর ১২২এ ও ১২২বি ধারা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আলেম-উলামা, মুফতি, ফকীহ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনেরও দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তবে এর নামে হেবার শরয়ী বিধান ও আল্লাহর নির্ধারিত ফারায়েজকে দুর্বল করা যাবে না। মানুষের তৈরি কোনো আইনকে আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ধর্মপ্রাণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত