বেনজীরকে ফেরাতে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার অনুরোধ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-নথিপত্র যাচাই করে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৭ এএম

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার আইনগত, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পুলিশি সহযোগিতার মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে সংসদ অধিবেশনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার অনুরোধ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-নথিপত্র যাচাই করে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের ১১ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করে এবং তা বর্তমানে কার্যকর আছে।

তিনি বলেন, এ বছরের ১২ জুন আবুধাবির এনসিবি (ইন্টারপোল) আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকাকে জানায় যে, বেনজীর আহমেদ আমিরাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। একইসঙ্গে আমিরাতের ফেডারেল আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানোর জন্য বাংলাদেশকে অনুরোধ জানায়। সেদিন আমি সংসদে স্টেটমেন্ট দিয়েছিলাম। বাংলাদেশ সরকার নির্ধারিত সময়সীমার জন্য অপেক্ষা না করে মাত্র ৪ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ১৬ জুন আমিরাতের সেন্ট্রাল অথরিটির কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট পাঠায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একই দিনে তথ্য ও সমন্বয়ের জন্য অনুরোধটির একটি অনুলিপি এনসিবি আবুধাবিকে দেওয়া হয়। নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ না পাঠানো বা এক্ষেত্রে দেরির যে ধারণা সৃষ্টি হয়েছে তা সঠিক নয়। বাংলাদেশ সরকার নির্ধারিত সময়সীমার যথেষ্ট আগেই প্রয়োজনীয় প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠিয়েছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় আমিরাতের অভ্যন্তরীণ আইন ও পারস্পরিক সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে প্রত্যর্পণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পর্যালোচনার পর আমিরাতের মিনিস্ট্রি অব জাস্টিস গত ৮ জুলাই অতিরিক্ত তথ্য ও নথিপত্র চায়। এগুলো হলো—স্পেসিফিক ল্যাঙ্গুয়েজে রেসিপ্রোসিটি আন্ডারটেকিং, আমাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এবং আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ। বাংলাদেশের আইনে মামলা দায়ের ও দণ্ড কার্যকরের তামাদি সংক্রান্ত বিধানের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ও সত্যায়িত অনুলিপি এবং উপযুক্ত বিচারিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা—এর অধিকাংশ আমরা আগেই দিয়েছি। এখানে, নথিপত্র একবার ইংরেজিতে করতে হয়, তারপর আরবিতে অনুবাদ করতে হয়, দুটোই অ্যাটেস্টেড করতে হয়, তারপর পাঠাতে হয়।

তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, সংশ্লিষ্ট বিচারিক ও আইনগত কর্তৃপক্ষ এবং এনসিবি ঢাকার সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়। গত ৪ আগস্ট এসব অতিরিক্ত তথ্য ও সাপোর্টিং ডকুমেন্টস কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পরে ২২ আগস্ট আমিরাতের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের আইনে মামলা দায়েরের তামাদি এবং দণ্ডের মেয়াদোত্তীর্ণতার বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট আইনি বিবৃতি ও সংশ্লিষ্ট আইনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ চায়। এসব তথ্য-নথি পাঠানোর জন্য ২২ সেপ্টেম্বর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে আইন ও বিচার বিভাগের আইনি মতামত গত ১ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত হয়। ২ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের মতামত পাওয়া যায়। উভয় মতামতের আলোকে আমিরাতের সেন্ট্রাল অথরিটির কাছে পাঠানোর জন্য একটি কম্প্রিহেনসিভ রিপ্লাই প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নথির সত্যায়ন এবং আরবি অনুবাদসহ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠানোর কার্যক্রম চলমান। আমি এখানে লবিতে বসেই সেই নথিতে সই করেছি একটু আগে।

তিনি আরও বলেন, প্রত্যর্পণ একটি বিচারিক রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া। শুধু ইন্টারপোলের রেড নোটিশ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গ্রেপ্তারের মাধ্যমে প্রত্যর্পণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়ে যায় না। অনুরোধপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের সেন্ট্রাল অথরিটি ও আদালত সেই দেশের আইন অনুযায়ী প্রত্যর্পণ অনুরোধ, অপরাধের প্রকৃতি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, প্রমাণাদি এবং অন্যান্য আইনগত শর্ত পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়।

মন্ত্রী বলেন,  সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের পক্ষে প্রত্যর্পণ কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা দিতে গত ৩০ জুলাই আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ল ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তিনি বলেন, বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন—এমন তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর এনসিবি ঢাকা গত ২ আগস্ট এনসিবি আবুধাবিকে এ বিষয়ে অব্যাহত সম্পর্ক বজায় রাখা, সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন ও বর্ডার কন্ট্রোল পয়েন্টগুলোতে নজরদারি নিশ্চিত করা এবং তার আইনগত ও অভিবাসনগত অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্পর্কে বাংলাদেশকে জানানোর অনুরোধ জানায়।

তিনি জানান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেনজীরের জামিন মঞ্জুর সংক্রান্ত আদেশের সত্যায়িত অনুলিপি সংগ্রহ করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জামিন পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের অনুরোধ জানিয়েছে।

বেনজীর আহমেদ আরব আমিরাতে অবস্থান করছেন জানিয়ে কোনো অনির্ভরযোগ্য উৎসের ভিত্তিতে তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন হবে না বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, তার অবস্থান অন্য কোনো দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ আইন, বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি বা পারস্পরিক সহযোগিতার নীতি এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় তাকে গ্রেপ্তার ও দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যর্পণ বা অন্য আইনসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে দুদকে পৃথক একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। ওই মামলায় বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণ করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত