নতুন বাস্তবতা

জোর দিন দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার ওপর

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৭ এএম

সময় ও প্রয়োজনের নিরিখে বিদ্যমান বাস্তবতায় শুধু নাম স্বাক্ষর করা বা অক্ষর চেনার দিন ফুরিয়ে গেছে। বর্তমান বাস্তবতায় সাক্ষরতার অর্থ শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়, বরং সাক্ষরতা হলোÑ পড়তে পারা তো বটেই, উপরন্তু এর অর্থও বুঝতে পারা এবং দৈনন্দিন জীবনে তা ব্যবহার করা। ৮ আগস্ট ‘সাক্ষরতার নতুন চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনটি আরও কিছু বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাব এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও ডিজিটাল দুনিয়ায় পুরোপুরি স্বনির্ভর হতে পারছেন না অনেকেই। আরও বলা এবং একই সঙ্গে প্রশ্নও রাখা হয়েছে, দেশে সাক্ষরতার হার বাড়ছে। মানুষ পড়তে ও লিখতে পারছে। কিন্তু দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে শুধু অক্ষরজ্ঞানই কি যথেষ্ট? না, প্রযুক্তির বিকাশের এই যুগে ও প্রযুক্তিনির্ভর অনেক কাজে শুধু অক্ষরজ্ঞানই যে যথেষ্ট নয়, তা তর্কাতীত বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান লেখক, ফটোগ্রাফার, পরিবেশ সংরক্ষণবিদ, এশীয় ও ডিজিটাল সংস্কৃতির গবেষক এবং ওয়ার্ড পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সম্পাদক, হোল আর্থ রিভিউর প্রাক্তন সম্পাদক ও প্রকাশক কেভিন কেলি যথার্থই বলেছেন, ‘মানুষ হলো প্রযুক্তির প্রজনন অঙ্গ, যা তাকে দৈনন্দিন বাড়িয়েই চলেছে।’ কাজেই অক্ষরজ্ঞানের পাশাপাশি এখন ন্যূনতম প্রযুক্তিজ্ঞান অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে।

সেলফোন এখন আর বিলাসিতা নয়, জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকের লেনদেন থেকে শুরু করে জমিজমার খাজনাপাতি পরিশোধ, এমনকি মোবাইল ফোনের আর্থিক সেবা কার্যক্রমেও ন্যূনতম প্রযুক্তিজ্ঞানের বিকল্প নেই। ডিজিটাল যুগে এর প্রয়োগের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে। সরকারি সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, চিকিৎসা, কেনাকাটা, বিল পরিশোধ কিংবা যোগাযোগ জীবনের নানা ক্ষেত্রে মানুষকে প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু অক্ষরজ্ঞান ও ডিজিটাল দক্ষতার মধ্যে অনেকের ব্যবধান যেন যোজন যোজন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আইসিটি সুবিধা ও ব্যবহার বিষয়ক জরিপ ২০২৫-২৬-এর সর্বসাম্প্রতিক তথ্যে প্রকাশ, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে পাঁচ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ এখনো ইন্টারনেটের বাইরে। অন্যদিকে দেশের ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের কাছে অন্তত একটি মোবাইল ফোন রয়েছে। প্রায় ৭৩ শতাংশ পরিবারের কাছে রয়েছে স্মার্টফোন। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে কম্পিউটার ব্যবহারকারীর হার মাত্র প্রায় ১২ শতাংশ।

এই প্রেক্ষাপটে আমরা মনে করি, শুধু সাক্ষরতাই শেষ কথা নয়, জোর দিতে হবে দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার ওপর। সাক্ষরতার ডিজিটালের সংযোগ ঘটানোর কর্মপরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নে বিশেষভাবে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের বক্তব্য, দেশে সাক্ষরতার বৃদ্ধির জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়, কিন্তু সেখানে ডিজিটাল সাক্ষরতার ধারণা থাকে না। আমরা এই অভিমতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি না। তা ছাড়া মানব-উন্নয়ন বিষয়ক যেকোনো প্রকল্প সৃজনে কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখা বাঞ্ছনীয়। সাক্ষরতার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এসব বিষয়েই মনোযোগ বাড়ানো সময়ের দাবি। মনে রাখা দরকার, প্রযুক্তির বিকাশের মূল লক্ষ্য জীবনযাত্রা সহজ ও গতিশীল করা। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা যদি তৈরি করা না যায় তাহলে তা হিতেবিপরীত হতে পারে। কারোর ওপর নির্ভর করে কিংবা সহায়তা নিয়ে সাময়িক চলা যেতে পারে, সবসময় নয়। কাগজে-কলমে যে স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যান আমরা পাই বাস্তবে এর সামঞ্জস্য কতটা আছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারি হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের চিত্রের অসামঞ্জস্যের অভিযোগ আছে। এই প্রেক্ষাপটে আমরা যদি ডিজিটাল জ্ঞানসম্পন্নদের হিসাব কষি তাহলে ব্যবধান-চিত্র আরও বেশি হবে। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিটি মহলের উল্লিখিত বিষয়গুলোর নিরিখে কাজের কাজ করা উচিত। বায়বীয় কথা নয়, আমরা চাই কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক সমাধান।

জগৎখ্যাত পরীক্ষামূলক ডকুমেন্টারি চিত্র নির্মাতা এবং সামাজিককর্মী যুক্তরাষ্ট্রের গডফ্রে রেগিও যথার্থই বলেছেন, ‘এখন আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার নয় বরং প্রযুক্তির ভেতরে বসবাস করি।’ অন্যদিকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান বলেছেন, ‘সাক্ষরতা হলো দুঃখ আর আশার মধ্যকার একটি সেতুবন্ধন।’ কাজেই আগে সাক্ষরতা তারপর কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমান্তরালে প্রযুক্তিজ্ঞান, এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়তে হবে অগ্রগামী সমাজ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত