বেনজীরের প্রত্যর্পণ ব্যর্থতা নিয়ে বিরোধী দলের প্রশ্ন

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৩ এএম

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে জাতীয় সংসদে ১৪৭ বিধিতে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমের আনীত প্রস্তাবের ওপর সরকার ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিতর্ক হয়। দুবাইয়ে আটকের পর দেশে ফিরিয়ে আনতে না পারার বিষয়টি সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে বিরোধী দল। তবে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

আলোচনা শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বহু ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর কীভাবে দুবাইয়ে জামিন পেলেন, এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথাশিগগির জাতীয় সংসদকে অবহিত করবেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারে মুখোমুখি করার জন্য সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, সে সম্পর্কে সংসদকে যথাসময়ে অবহিত করার প্রস্তাবটি ভোটে দিলে কণ্ঠভোটে তা গৃহীত হয়।

সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম প্রস্তাবে বেনজীরের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপের বিবরণ সংসদে উপস্থাপনের দাবি জানান। প্রস্তাবে তিনি বলেন, বহু মামলায় অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীরের দুবাইয়ে জামিনে মুক্তিলাভ এবং অতঃপর সেন্ট লুসিয়ায় গমনের ঘটনা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় গুরুতর ব্যর্থতার পরিচায়ক। তাই এই সংসদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি করছে যে, নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ প্রেরণসহ গৃহীত সব পদক্ষেপের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ; প্রেরিত নথিপত্রে কোনো ত্রুটি ছিল কি না এবং ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের চিহ্নিতকরণ; ছয়টি দেশের পাসপোর্ট প্রাপ্তির বিষয়ে তদন্তের অগ্রগতি ও তাকে সেন্ট লুসিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তার অবৈধ সম্পদ জব্দের পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন অনতিবিলম্বে সংসদে উপস্থাপন করা হোক।

আলোচনায় অংশ নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে। তিনি সেন্ট লুসিয়ায় যাননি। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে সরকার কাজ করছে এবং দুবাইয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসও বিষয়টি নজরদারিতে রাখছে। বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় আনতে উদ্যোগ নেবে সরকার। বেনজীরে দেশে এনে বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা প্রায় অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, বেনজীর ছাড়াও বিদেশে অবস্থানরত অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আরব আমিরাত ও ভারতের সঙ্গে থাকা বন্দি প্রত্যর্পণসংক্রান্ত ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন। এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বেনজীরকে দেশে ফেরাতে আইনি পদক্ষেপ কতটা সুচারুভাবে নেওয়া হয়েছিল, তা সংসদে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। শুধু বেনজীর নয়, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনতেও সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দরকার। একই সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অপরাধ কর্মকা-ের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মার্জিয়া বেগম বলেন, জাগপা সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধানও বেনজীরকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি রয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ জুন আরব আমিরাতের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো ঢাকাকে জানায়, বেনজীর আহমেদকে সেখানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর মাত্র চার দিনের মধ্যে ১৬ জুন কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হয়। একই দিনে এর একটি অনুলিপি এনসিবি আবুধাবিতেও পাঠানো হয়। ফলে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়েছে এমন অভিযোগ সঠিক নয়। বাংলাদেশ ও আমিরাতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। এ কারণে ইউএইর অভ্যন্তরীণ আইন এবং পারস্পরিকতার নীতির ভিত্তিতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এরপর ২২ আগস্ট ইউএইর কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ আরও কিছু সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা এবং মামলা পরিচালনার সময়সীমা ও সাজা কার্যকরের মেয়াদ শেষ হওয়া-সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট আইনের পূর্ণাঙ্গ পাঠ চেয়েছে। এ বিষয়ে ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জবাব দেওয়ার সময়সীমা রয়েছে। আইন ও বিচার বিভাগের এবং দুদকের মতামত পাওয়া গেছে। এখন সমন্বিত জবাব প্রস্তুত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা পাঠানো হবে। বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ দূতাবাস আবুধাবির মাধ্যমে আইনজীবীও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বেনজীরের সেন্ট লুসিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিদেশে থাকা বেনজীর ও তার পরিবারের সম্পদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আইন, আদালতের আদেশ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো অনুযায়ী সম্পদ অবরুদ্ধ, জব্দ, বাজেয়াপ্ত বা দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে সরকারি দল ও বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সংসদে মতবিরোধ, বিতর্ক ও বহুমত থাকবে। তবে ‘ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের’ প্রশ্ন এলে তার প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত