রোবটের হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে আফিয়া হুমায়রা

ব্রোঞ্জের পর এসেছে রৌপ্য। সামনে লক্ষ্য আরও বড়। আর সেই লক্ষ্যের পথে আফিয়া হুমায়রার হাতে রোবট, চোখে বিশ্বমঞ্চ এবং স্বপ্নে বাংলাদেশের পতাকা।

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৮ পিএম

রোবটের ছোট ছোট যন্ত্রাংশ, কোডের কয়েকটি লাইন আর সমস্যার সমাধানের চেষ্টা—এই তিনের সমন্বয়েই যেন নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পান আফিয়া হুমায়রা। বয়সে এখনও তরুণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক রোবোটিক্সের মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরার অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যেই তাঁর ঝুলিতে।

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী আফিয়া হুমায়রা এখন বাংলাদেশের তরুণ রোবোটিক্স প্রতিভাদের অন্যতম পরিচিত মুখ। ‘সাইবার স্কোয়াড’ দলের নেতৃত্ব দিয়ে পরপর দুই বছর বিশ্ব রোবট অলিম্পিয়াডের আন্তর্জাতিক আসরে সাফল্য পেয়েছেন তিনি। ২০২৪ সালে তুরস্কের ইজমিরে অনুষ্ঠিত World Robot Olympiad-এ তাঁর নেতৃত্বাধীন দল ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে। ২০২৫ সালে সেই সাফল্যকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফাইনালে দলটি রৌপ্য পদক অর্জনের পাশাপাশি নবম স্থান লাভ করে।

তুরস্কে প্রথম বড় সাফল্য

২০২৪ সালের WRO ছিল আফিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে বড় পরীক্ষা। ইজমিরে অনুষ্ঠিত ওই আসরে ৮৭টি দেশের ৫৬০টি দল অংশ নেয়। বাংলাদেশের হয়ে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে ছিল ‘সাইবার স্কোয়াড’। আফিয়ার নেতৃত্বে দলটি ফিউচার ইনোভেটরস বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে।

এই সাফল্য শুধু একটি পদক অর্জন ছিল না; আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের তরুণদের সক্ষমতারও প্রমাণ হয়ে ওঠে এটি। বাংলাদেশের হয়ে ওই আসরে দুটি দল ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে—আফিয়া হুমায়রার নেতৃত্বাধীন ‘সাইবার স্কোয়াড’ এবং সাদিয়া আনজুম পুষ্পর নেতৃত্বাধীন ‘চেইঞ্জ মেকার্স ২০২৪’।

দেশের গণমাধ্যমেও তখন বিশেষভাবে উঠে আসে আফিয়ার নেতৃত্বের বিষয়টি। কারণ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পদকজয়ী দুই দলের নেতৃত্বেই ছিলেন নারী শিক্ষার্থী।

ব্রোঞ্জ থেকে রৌপ্য

সাফল্যের পর থেমে থাকেননি আফিয়া। ২০২৫ সালের জাতীয় রাউন্ডে ‘সাইবার স্কোয়াড’ আবারও নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেয়। ফিউচার ইনোভেটরসের জুনিয়র গ্রুপে দলটি স্বর্ণপদক অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায়। জাতীয় পর্বে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণ জয়ের পর আফিয়া বলেছিলেন, ‘This gold medal is a huge inspiration for us. We want to take on more challenges in robotics and bring international success for Bangladesh.’ অর্থাৎ এই অর্জন তাঁদের আরও বড় চ্যালেঞ্জ নেওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য সাফল্য বয়ে আনতে তাঁরা আরও এগিয়ে যেতে চান।

এরপর গন্তব্য সিঙ্গাপুর। ২০২৫ সালের ২৬ থেকে ২৮ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের Marina Bay Sands Expo-তে বসে বিশ্ব রোবট অলিম্পিয়াডের আন্তর্জাতিক ফাইনাল। এতে বাংলাদেশের নয়টি দল অংশ নেয়। আফিয়ার নেতৃত্বাধীন ‘সাইবার স্কোয়াড’ ফিউচার ইনোভেটরসের জুনিয়র গ্রুপে নবম স্থান অর্জন করে রৌপ্য পদক পায়।

শুধু প্রতিযোগী নন, এখন প্রশিক্ষকও

আফিয়ার গল্পের গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পদক জয়ের পর তিনি শুধু নিজের সাফল্যের মধ্যেই আটকে থাকেননি। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের রোবোটিক্সের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কাজেও যুক্ত হয়েছেন।

সম্প্রতি ক্র্যাব ও উইংস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ROBOGENESIS: Igniting the Future of Robotics’ শীর্ষক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আফিয়া। সেখানে ক্র্যাব সদস্যদের সন্তানদের রোবোটিক্সের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়, প্রকল্পভিত্তিক কাজ ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে হাতে-কলমে ধারণা দেন তিনি।

একসময় যিনি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শেখার জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন, এখন তিনিই অন্যদের শেখানোর জায়গায় দাঁড়াচ্ছেন। একজন তরুণ রোবোটিক্স প্রতিযোগীর বিকাশের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনটিই হয়তো সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।

নেতৃত্বের জায়গায় একজন তরুণী

রোবোটিক্সকে অনেক সময় জটিল প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও কোডিংয়ের জগৎ হিসেবে দেখা হয়। সেই জায়গায় আফিয়ার নেতৃত্ব আরেকটি বার্তা দেয়—প্রযুক্তির মঞ্চে মেয়েদের অংশগ্রহণ শুধু সম্ভবই নয়, নেতৃত্ব দেওয়াও সম্ভব।

২০২৪ সালে তুরস্কের আন্তর্জাতিক আসরে আফিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ‘সাইবার স্কোয়াড’ ব্রোঞ্জ পদক জেতে। পরের বছর সিঙ্গাপুরে একই দলের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি রৌপ্য পদক অর্জন করেন। অর্থাৎ তাঁর সাফল্যের ধারাবাহিকতা শুধু পদকের রং বদলানোর গল্প নয়; এটি নেতৃত্ব, দলগত কাজ এবং ধারাবাহিক অনুশীলনের গল্পও।

বাংলাদেশের জন্য যে স্বপ্ন

আফিয়ার নিজের কথাতেই তাঁর লক্ষ্যটা পরিষ্কার—আরও বড় চ্যালেঞ্জ নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য সাফল্য নিয়ে আসা। ২০২৫ সালের জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণ জয়ের পর তাঁর বক্তব্যেও এই প্রত্যয়ের প্রকাশ পেয়েছিল।

রোবোটিক্সের বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, মেশিন ভিশন ও স্মার্ট প্রযুক্তির সঙ্গে রোবোটিক্সের সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সময়ে বাংলাদেশের তরুণদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও সাফল্য ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আফিয়া হুমায়রার পথচলা তাই শুধু একজন শিক্ষার্থীর পদক জয়ের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের একদল তরুণের স্বপ্ন দেখার গল্প—যেখানে রোবট কেবল যন্ত্র নয়, বরং উদ্ভাবন, নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার।

ব্রোঞ্জের পর এসেছে রৌপ্য। সামনে লক্ষ্য আরও বড়। আর সেই লক্ষ্যের পথে আফিয়া হুমায়রার হাতে রোবট, চোখে বিশ্বমঞ্চ এবং স্বপ্নে বাংলাদেশের পতাকা।

 

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত