স্বীকার করতেই হবে যে, বিশে^র কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের পক্ষে এত দ্রুততর সময়ে এবং এত সহজ উপায়ে অর্থশালী, বিত্তশালী, সম্পদশালী হওয়ার নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ বাংলাদেশে সেটা যে সম্ভব, সেটা তো আমরা স্বাধীনতার পর হতে এ যাবৎ দেখে আসছি। দেখে দেখে ইতিমধ্যে অভ্যস্তও হয়ে পড়েছি। কে, কীভাবে, কত দ্রুত হতদরিদ্র থেকে কোটিপতি বনে গেলেন, এতে আর বিস্মিত হই না। অনেকেই এই হঠাৎ বিত্তবান হওয়াকে সৃষ্টিকর্তার অনুদান-কৃপাও বলে থাকেন। প্রভুর অসীম দয়ায় হঠাৎ বিত্তবানদের ভাগ্য বদলের সুখ্যাতি। বাস্তবে তারা চরম অনৈতিক ঘৃণ্য পন্থা অবলম্বন করেই যে হঠাৎ বিত্তশালী হয়েছেন, সেই সত্যটি কেউ বলে না।
সামাজিকভাবে তাদের নিয়ে প্রশ্নও ওঠে না। বিপরীতে তারা সমাজে মর্যাদাবান রূপেই গণ্য হন। সবাই সমীহ করে তাদের বরং বিশেষ সামাজিক মর্যাদা দিয়ে থাকেন। সমাজ এবং সামাজিক আচার-সংস্কৃতি আর আগের মতো নেই। বদলে গেছে ১৮০ ডিগ্রিতে। নীতি, নৈতিকতা, সততা মূল্যহীন হয়ে পড়েছে সর্বত্র। রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ ও পরিবারের সর্বত্রই সেটা সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় ছড়িয়ে পড়েছে। সেটা রোধ করা তো পরের কথা বরং বিদ্যমান ব্যবস্থা ওইসব ব্যক্তিগত অনৈতিক অর্জনকেই কৃতিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। অন্যের সম্পদ হাতিয়ে হঠাৎ বিত্তবান হওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার অবসান তো ঘটেইনি। বরং ক্রমাগত স্ফীত হয়ে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। এই প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে গড়ে উঠেছে। দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আমরা দেখে আসছি কতিপয়ের হঠাৎ বিত্তশালী হওয়ার নজির। রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যে ক্রিয়াশীল থাকায় লুণ্ঠনকারীরা অবাধে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে। সেই অপপ্রক্রিয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে তা বলা যাবে কি?
দেশে ঘুষ-দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। অথচ আইনের যথাযথ প্রয়োগ হয় না প্রায়ই। ঘুষ-দুর্নীতির নানা সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। এতে অনুমান করা যায় ওই ব্যাধিটি কোথায় কোথায় তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পেরেছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে এই ব্যাধি নির্মূলের দায়িত্বে অথচ ব্যাধির বিস্তার সর্বত্র বিরাজিত বলেই প্রায় সবাই ওই অবৈধ-অনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে পড়েছে। শর্ষের মধ্যেই যদি ভূত থাকে তবে সে শর্ষে দিয়ে তো আর ভূত বিতাড়নের উপায় থাকে না। ব্যাধিটির ক্রমাগত বিস্তার ঘটছে এবং করবে, সেটাই স্বাভাবিক। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় বিদ্যমান ব্যবস্থায় সহজ নয় বলেই মনে করি। সার্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তন না ঘটলে এ অপতৎপরতা রোধ করা যাবে না। আমরা যে ব্যবস্থাধীনে রয়েছি, সেটি পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। পুঁজিবাদী দর্শনের মূল ভিত্তিই হচ্ছে মুনাফা, সেটা যে উপায়ে হোক না কেন। পাশাপাশি এই দর্শনে রয়েছে ব্যক্তির উন্নতি, ভাগবাদিতা, নিকৃষ্ট নানা মাধ্যমের অসুস্থ বিনোদন। দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন-ধর্ষণ-নিপীড়ন চলছে নানাভাবে। বিষয়টি ঘৃণিত সংবাদ জেনে জেনে মানুষের গা-সওয়া হয়ে গেছে। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আর কত বিষয়ে করা যায়! প্রতিকারহীন ঘৃণিত অনভিপ্রেত সংবাদ তাই প্রকাশ পেলেও মানুষের মানবিক মূল্যবোধে রেখাপাত যে পরিমাণে করা উচিত, ঘটনার ধারাবাহিকতায় সেটা করছে না। মানুষ নির্বিকারভাবে কেবল জানছে।
পতিত রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে নানা মহল থেকে অভিযোগ উঠেছিল, সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধিতে যেন রাজনৈতিক পরিচয় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্তরা অভিযোগ করেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিকার পান না এ অভিযোগ প্রকৃতই নতুন নয় । দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার সংস্কৃতি-দর্শন ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়ে এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। অতীতে আলোচনায় আসা ক্যাসিনো কাণ্ডের পেছনেও ওই অপসংস্কৃতি ক্রিয়াশীল। রাজনৈতিক পরিচয় বা ছত্রছায়ায় দুর্বৃত্তায়নের ধারাবাহিক পরিণতিই রয়েছে এসব কাণ্ডের মূলে, এমনটি অতীতে বহুবার দেখা গেছে। দেশে জঙ্গি তৎপরতা রোধে আমাদের গোয়েন্দা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও দক্ষতা প্রশংসনীয়। কিন্তু সামাজিক অপরাধ রোধে আশাভঙ্গের কারণ ফিরে ফিরে দেখা যায়। রাজনীতি এখন অনেকেরই পেশায় পরিণত হয়েছে। চাকরি, ব্যবসা অপরাপর জীবিকার ন্যায় রাজনীতিও অনেকেরেই যেন জীবিকা। এও অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক পরিচয়ে অবাধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ঠিকাদারিসহ অবৈধ পন্থা অবলম্বনে দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার স্বপ্ন পূরণের মোক্ষম সুযোগ রয়েছে রাজনীতি ব্যবসায়। আমাদের দেশে রাজনীতিকদের আর্থিক কেলেঙ্কারির পেছনেও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির স্পর্শ রয়েছে তাও বহুবার দেখা গেছে।
স্বাধীনতার পর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের ঘোড়দৌড়ের প্রকাশ্য জুয়া খেলা বন্ধ করা হয়। ওই রেসের জুয়ায় কত মানুষ যে নিঃস্ব হতো সেটা প্রত্যক্ষদর্শীরাই দেখেছে, জেনেছে। পাকিস্তানি আমলে বৈধতা পেয়েছিল রমনার রেসকোর্স মাঠের ঘোড়দৌড়ের জুয়ার আসর। হঠাৎ বিত্তবান বনে যাওয়ার হার বেড়ে যাওয়ার মূলে রাজনৈতিক পরিচয় যে ক্রিয়াশীল, এই অভিযোগ নতুন নয়। আমাদের বুর্জোয়া রাজনীতি এবং রাজনীতিকদের অনেকেই ক্ষমতার মোহে সমাজবিরোধীদের আশকারা দেন, প্রতিপালন করেন এসব কদর্যতা বহুবার দৃশ্যমান হয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রে যারা ক্ষত সৃষ্টি করে তারা দেশ-জাতির বড় শত্রু। মূল্যবোধের ধস, অবক্ষয়ের স্রোত, অনৈতিকতার আস্ফালন এসবই রাজনীতির নাম অপরাজনীতির দুঃখজনক ফল।
আমাদের রাজনীতি তো শ্রীহীন ছিল না। এই রাজনীতির অর্জন অনেক। কিন্তু যেসব কারণে রাজনীতি শ্রীহীন হয়েছে তা রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের আত্মস্থ করা খুব জরুরি। অনাচার-অবিচার-দুরাচার-কদাচারের পথ রোধ করার দায় সবার আগে বর্তায় রাজনীতিকদের ওপর। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়টিও সমগুরুত্বেই সামনে আসে। রাজনীতিকে যেন কেউ ফুলে ফেঁপে ওঠার সিঁড়ি বানাতে না পারেন এ ব্যাপারে বিলম্বে হলেও এখনই মনোযোগ গভীর করার বিকল্প নেই।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত