গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হামের প্রাদুর্ভাবে এক হাজার দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৯০২ জন হামের উপসর্গে এবং ১০০ জন হামে মারা গেছে। হামের চেয়ে হামের উপসর্গে মৃত্যু ৯ গুণ বেশি। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র প্রকাশিত হাম পরিস্থিতিবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৭৯ দিনে এত শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ছয়জন শিশু মারা গেছে, এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়। এটি এক হাজার দুইটি পরিবারের শোকের ইতিহাস। এক হাজার দুইটি জানাজা। এক হাজার দুইটি ছোট কবর। এক হাজার দুইটি মায়ের বুকফাটা কান্না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় হাম প্রাদুর্ভাবের নজির খুব কমই রয়েছে। এই মৃত্যুর পেছনে বিগত দুইটি সরকারের অবহেলা আর খামখেয়ালি সিদ্ধান্তকে দায়ী করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ, বিভিন্ন আন্তজাতিক প্রতিষ্ঠান ও বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, নিয়মিত ইপিআই টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘœ, বহু শিশুর সময়মতো হাম-রুবেলা টিকার দুই ডোজ পায়নি, ২০২৪-২৫ সালে টিকাদান কভারেজ কমে যায়, এতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের রোগী পাওয়া গেছে এক লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০ জন। হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৯০৪ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ৪৭ হাজার ৩৯৩ শিশু। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে এক লাখ ৪১ হাজার ৮১৯ শিশু।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা এখন টিকা দিচ্ছি ছয় মাসে। কিন্তু ছয় মাসের আগে যে শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, সে না পাচ্ছে টিকা, না পাচ্ছে মায়ের থেকে ইমিউনিটি। সেজন্য আমি মনে করি, ছয় মাসের এই শিশুদের মায়েরা অতীতে টিকা পায়নি বলে তাদের ইমিউনিটি গড়ে ওঠেনি। সেজন্য তাদের গর্ভের সন্তানরা ইমিউনিটি পাচ্ছে না। এখন যেটা করতে হবে, সন্তান নেওয়ার আগে কয়েক বছর মায়েদের টিকা দিয়ে দিতে হবে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। কিন্তু তা নজরে আসে বিএনপি সরকার গ্রহণের কয়েকদিনের মাথায়। তারপর সরকার তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থা নেয়। ২ কোটির বেশি শিশুকে হামের টিকা দেয়। ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হামের তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। ২ এপ্রিল থেকে নিয়মিত তা সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়।
মাসিক মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২ এপ্রিল পর্যন্ত ৪০ জন, ২ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ২৩৪ জন, ৩০ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৩১১ জন, জুনে ১৩৩ জন ও জুলাইয়ে ১১৪ জন, আগস্টে ১৩৩ জন মারা যায়। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে মে মাসে। তারপর এপ্রিলে। এখনো প্রতিদিন প্রাণহানির সংখ্যাটি উদ্বেগজনক। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকায় ৪০৪ জন, তারপর সিলেট ১৫৬, রাজশাহী ৯২, ময়মনসিংহ ৭৭, চট্টগ্রাম ৬৫, বরিশাল ৫৭, খুলনা ৩৭, রংপুর ১৪ জন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, এখন যেসব শিশু হামে মারা যাচ্ছে তাদের মধ্যে নিউমোনিয়ার জটিলতা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে, যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসতেছে, তাদের কারও কারও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধে কাজ করছে না। ফলে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে মারা যাচ্ছে। আবার অনেক শিশু দুই ডোজ টিকা পায়নি এবং পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত ৬৫ শতাংশ শিশু মাঝারি থেকে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। সুতরাং বলা যায়, নানা কারণেই এখনো শিশুরা মারা যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থাপনা না নেওয়া ও জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করাসহ সরকারের বেশ কিছু ভুলের কারণেই হামে মৃতের সংখ্যা এত বেশি হয়েছে। সময়মতো প্রস্তুতি নিলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো। ভিটামিন ‘এ’র অভাব ও পুষ্টিহীন শিশুরা টিকা না পাওয়ায় রোগপ্রতিরোধ কমে গেছে। ফলে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে পরিকল্পনা করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, মোট মৃতের সংখ্যাটা শিউরে ওঠার মতো। তবে এখন মৃত্যুর হার অনেক কমে গেছে। টিকাদান কর্মসূচিও চলমান আছে। এটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।