ন্যায়বিচার কি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫১ এএম

৬ আগস্ট দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে, দেশ রূপান্তরের তরফে কিছু কেসস্টাডি পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে প্রায় ৭৪ শতাংশ ফাঁসির রায়ই হাইকোর্টে এসে টিকছে না। এই বিষয়টি একদিকে প্রশ্নবোধক, অন্যদিকে ন্যায়বিচারের অন্তরায়। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা, একজন ফৌজদারি আইন বিশ্লেষক, একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বর্তমানে কর্মরত ও অবসরে যাওয়া দুজন জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ, হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের দুজন আইনজীবীর অভিমত বিশ্লেষণে প্রতীয়মান বিচারিক আদালতের কিছু বিচারকের মধ্যে ব্যাপকহারে প্রাণদণ্ড দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এই প্রেক্ষপটে বলা যায়, জীবন কবিতা নয়, জীবন গল্পও নয়। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই কবিতা ও গল্পের জন্ম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শাস্তি গল্প তাই নিছক পারিবারিক মান-অভিমানের গল্প নয়। এটি সত্য, সমাজিক চাপ, স্বীকারোক্তি এবং বিচারিক সিদ্ধান্তের মধ্যকার এক গভীর বিচ্ছেদের গল্প। শাস্তি গল্পের চন্দরা এমন একটি হত্যার দায় স্বীকার করে, যা সে করেনি। ফলে স্বীকারোক্তি, সাক্ষ্য ও প্রকৃত সত্যের মধ্যে একটি বিপজ্জনক দূরত্ব তৈরি হয়।

সমাজিক চাপে আদালতের সামনে যে ‘সত্য’ প্রতিষ্ঠিত হয়, তা শেষ পর্যন্ত ঘটনার প্রকৃত সত্যকে প্রতিফলিত করে না। চন্দরার মৃত্যুদণ্ড এই ব্যবধানকে একটি মর্মান্তিক পরিণতিতে নিয়ে যায়। যেকোনো বহুল আলোচিত ফৌজদারি মামলায় তাই ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার এবং অভিযুক্তের জন্য ন্যায্য বিচারের মধ্যে যে সামাজিক টানাপড়েন তৈরি করে, সেখানেই বিপদে শুরু। ফেনীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে যে ব্যাপক জনসমর্থন, সহানুভূতি ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিঃসন্দেহে বোধগম্য।  আদালতের দায়িত্ব জনমতের প্রতিফলন ঘটানো নয়; বরং তথ্য ও প্রমাণকে আইনসম্মত, নিরপেক্ষ এবং যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তে রূপান্তর করা। সেখানে গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিচার একটি বাস্তব ঝুঁকি সৃষ্টি করে। বিচারিকভাবে প্রমাণ যাচাই হওয়ার আগেই গণমাধ্যমের প্রচারণা জনমনে অভিযুক্তের অপরাধ সম্পর্কে একটি দৃঢ় ধারণা তৈরি করতে পারে। কোনো অপরাধের অভিযোগ প্রথম যে প্রশ্ন মাথায় আসা উচিত তা হলো, অপরাধটি সংঘটিত হয়েছে কিনা এবং অভিযুক্ত তার জন্য আইনগতভাবে দায়ী কিনা। দ্বিতীয় যে  প্রশ্ন আসা উচিত তা হলো, অভিযুক্তের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা এমন মাত্রার কিনা, যাতে মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি তার জন্য ন্যায্য হতে পারে। যেকোনো যৌথভাবে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দণ্ডবিধির ধারা ৩৪, ষড়যন্ত্রসংক্রান্ত বিধান মতে কিংবা বিশেষ ফৌজদারি আইনের অধীনে একাধিক ব্যক্তি একই অপরাধের জন্য দায়ী হতে পারেন।

একই অপরাধে আইনগত দায়বদ্ধতা থাকা মানেই প্রত্যেকের নৈতিক ও বাস্তব দায়বদ্ধতা সমান নাও হতে পারে। ধরা যাক, কেউ অপরাধের পরিকল্পনাকারী, কেউ সরাসরি বাস্তবায়নকারী, কেউ সহায়তাকারী, আবার কারও ভূমিকা তুলনামূলকভাবে গৌণ। তাই একই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেও সবার দায় ও সাজা এক হওয়ার কথা নয়। মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে আদালতকে ‘দলটি অপরাধ করেছে’ থেকে ‘দলের প্রত্যেক সদস্য একই শাস্তির যোগ্য’ এই সমীকরণ এড়িয়ে যেতে হয়। নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল; কিন্তু পরবর্তী আপিল পর্যায়ে ১০ জন খালাস, ৪ জনের সাজা যাবজ্জীবনে রূপান্তর এবং ২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। এই ভিন্ন পরিণতি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে, অপরাধে সম্মিলিত সম্পৃক্ততা থাকলেও প্রত্যেক অভিযুক্তের ব্যক্তিগত ভূমিকা ও দায় কি

পৃথকভাবে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল? ন্যায়সংগত সাজা নির্ধারণের কেন্দ্রে থাকা উচিত ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা। অভিপ্রায় ও অংশগ্রহণ, কার্যকলাপ, প্রমাণের শক্তি ও নির্ভরযোগ্যতা, ব্যক্তিগত দায়ের মাত্রা, গুরুতরকারী ও প্রশমক পরিস্থিতি, আনুপাতিক শাস্তি হতে পারে একটি সুসংগত বিচারিক কাঠামো। এর উদ্দেশ্য বিচারকের বিবেচনাধিকার সীমিত করা নয়; বরং তা আরও সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা। মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে আনুপাতিকতার প্রশ্নটি অন্তত তিন স্তরে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, অপরাধ কতটা গুরুতর; দ্বিতীয়ত, এই নির্দিষ্ট অভিযুক্তের ভূমিকা, অভিপ্রায় ও দায় কতটা গুরুতর; তৃতীয়ত, যাবজ্জীবনসহ কম কঠোর শাস্তি যথেষ্ট না হলে কেন মৃত্যুদণ্ডই প্রয়োজন। অতএব, শুধু ‘অপরাধটি নৃশংস’, এটি মৃত্যুদণ্ডের জন্য যথেষ্ট যুক্তি নয়। আদালতকে ব্যাখ্যা করতে হবে, কেন এই নির্দিষ্ট ব্যক্তির দায় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কম কঠোর কোনো শাস্তি ন্যায়সংগত হবে না। এখানেই মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায় ও শাস্তির আনুপাতিকতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

ভারতে বচ্চন সিং বনাম পাঞ্জাব রাজ্য (১৯৮০) মামলায় সুপ্রিমকোর্ট মৃত্যুদণ্ডের সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রাখলেও একে ‘বিরলতমের মধ্যে বিরলতম’ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখার নীতি প্রতিষ্ঠা করে। অপরাধের ভয়াবহতার পাশাপাশি অভিযুক্তের প্রশমক পরিস্থিতি বিবেচনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। মাচ্ছি সিং (১৯৮৩) মামলায় এই নীতির প্রয়োগ আরও কাঠামোবদ্ধ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে উডসন, লকেট ও গ্রেগ মামলাতেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাজা, প্রশমক পরিস্থিতি এবং নিয়ন্ত্রিত বিচারিক বিবেচনাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইনব্যবস্থা ভিন্ন হলেও নীতিগত উদ্বেগ অভিন্ন মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তিতে বিচারিক ভুল, অসামঞ্জস্য ও স্বেচ্ছাচারিতার ঝুঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা। নুসরাত হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। পরবর্তী আপিল পর্যায়ে ১০ জন খালাস, চারজনের সাজা যাবজ্জীবনে রূপান্তর এবং দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। এই ভিন্ন পরিণতি তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে, সম্মিলিত অপরাধে সম্পৃক্ততা থাকলেও প্রত্যেক অভিযুক্তের ব্যক্তিগত ভূমিকা, দায়, প্রমাণ এবং প্রশমক পরিস্থিতি কি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল?

বাংলাদেশের আপিল বিভাগও ধীরে ধীরে সাজা নির্ধারণে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও কাঠামোবদ্ধ বিচারিক বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার দিকে এগিয়েছে। আতাউর মৃধা বনাম রাষ্ট্র (২০১৭) মামলাসহ পরবর্তী বিচারিক বিকাশে স্পষ্ট হয়েছে শুধু আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তি নয়, বরং অপরাধের প্রকৃতি ও পরিস্থিতি এবং অভিযুক্তের ব্যক্তিগত দায়ও সাজা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালের রাষ্ট্র বনাম মো. লাভলু মামলাতেও অপরাধীর বয়স ও চরিত্র, পূর্ব অপরাধের ইতিহাস, সামাজিক ও পারিবারিক পটভূমি, পুনর্বাসনের সম্ভাবনা এবং গুরুতরকারী ও প্রশমক পরিস্থিতি বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পৃথক সাজা-শুনানির ধারণাও এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক পদ্ধতিকে আরও শক্তিশালী করে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় সাজা নির্ধারণের প্রশ্নটি ধীরে ধীরে ‘আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি কত’ থেকে ‘এই নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য কোনো শাস্তি ন্যায়সংগত ও আনুপাতিক’, এই প্রশ্নের দিকে এগোচ্ছে। মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে এই নীতির প্রয়োগই হওয়া উচিত সবচেয়ে কঠোর। আপিল পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ডের বড় ধরনের পরিবর্তন বা বাতিল শুধু পৃথক মামলার ফল নয়; এটি প্রমাণ মূল্যায়ন ও সাজা নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন তোলে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ২০টি ডেথ-রেফারেন্স মামলায় ৪৯টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ১৩টি বহাল এবং ৩৬টি পরিবর্তিত বা বাতিল হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অর্থাৎ প্রায় ৭৪ শতাংশ সাজা উচ্চ আদালতে টেকেনি। এই পরিসংখ্যান, যদি বৃহত্তর বিচারিক প্রবণতার প্রতিফলন হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনার দাবি রাখে। (দেশ রূপান্তর, ৬ আগস্ট, ২০২৬)

নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলাতেও নিম্ন আদালতের ১৬টি মৃত্যুদণ্ডের বিপরীতে হাইকোর্ট ২টি বহাল, ৪টি যাবজ্জীবনে রূপান্তর এবং ১০টি খালাস দিয়েছেন। এটি দেখায়, একই মামলায় অভিযুক্তদের দায় ও শাস্তির বিষয়ে উচ্চ আদালতের মূল্যায়ন কতটা ভিন্ন হতে পারে। এর অর্থ এই নয়, নিম্ন আদালত শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা উচ্চ আদালতের সংশোধন ভুল। বরং প্রশ্নটি আরও মৌলিক, এত বড় মাত্রায় সংশোধনের প্রয়োজন হলো কেন? যদি মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি বারবার আপিল পর্যায়ে পরিবর্তিত হয়, তবে প্রথম পর্যায়ের বিচারেই প্রমাণ, ব্যক্তিগত দায় ও সাজা নির্ধারণের কাঠামোকে আরও নির্ভুল করা জরুরি। কারণ মৃত্যুদণ্ড ও কারাদণ্ডের মধ্যে শুধু মাত্রাগত নয়, গুণগত পার্থক্য রয়েছে। কারাদণ্ড সংশোধন বা বাতিল করা সম্ভব; মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকে না। তাই প্রতিটি মৃত্যুদণ্ডের রায়ে অন্তত তিনটি প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর থাকা উচিত। এক. অপরাধটি কতটা গুরুতর, দুই. এই নির্দিষ্ট অভিযুক্ত কতটা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী, তিন. যাবজ্জীবনসহ কম কঠোর কোনো শাস্তি কেন যথেষ্ট নয়। তৃতীয় প্রশ্নটিই মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণের সবচেয়ে কঠিন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

বাংলাদেশে এখনই শুধু মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নে একটি মৌলিক উত্তর প্রয়োজন। মৃত্যুদণ্ড কি জনতুষ্টি ও আবেগের প্রতিফলন হবে, নাকি ব্যক্তিগত দায়, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, আনুপাতিকতা ও যুক্তিনির্ভর বিচারিক সিদ্ধান্তের ফল হবে? এজন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট সাজা-নির্দেশিকা, কার্যকর পৃথক সাজা-শুনানি, প্রত্যেক অভিযুক্তের ব্যক্তিগত দায়ের পৃথক মূল্যায়ন, কঠোর প্রমাণ যাচাই এবং গুরুতরকারী ও প্রশমক পরিস্থিতির সুস্পষ্ট বিশ্লেষণ। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের ন্যায়বিচার তার কঠোরতায় নয় বরং কাকে, কেন এবং কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এই অপরিবর্তনীয় শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে। অপরাধের ভয়াবহতা সামষ্টিক হতে পারে, কিন্তু দায় ব্যক্তিগত।  জনক্ষোভ সামষ্টিক হতে পারে, কিন্তু শাস্তি হতে হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ন্যায়বিচার জনতুষ্টির কাছে নত হয় না।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ

বাংলাদেশ  বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত