ভোলার কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার, আর সেই সার ধরা পড়ছে মিয়ানমারে পাচারের পথে। কখনো ট্রাকে, কখনো ট্রলারে, কখনো মাছ ধরার বোটে নদী ও উপকূলের ঘাট ব্যবহার করে পাচারের চেষ্টা চলছে সরকারি বরাদ্দের ইউরিয়া ও টিএসপি সার। গত দুই মাসে ভোলার চরফ্যাশন ও তজুমদ্দিনে পরপর চারটি বড় চালান আটক হয়েছে। এর বাইরে ভোলার উপকূলঘেঁষা হাতিয়া ও চরফ্যাশনের বিভিন্ন নৌপথেও বড় চালান আটক হয়েছে। এসব ঘটনায় ভোলার নদীপথে সার পাচারের একটি ধারাবাহিক চিত্র সামনে আসার পাশাপাশি পাচারের রুটও দৃশ্যমান হচ্ছে।
প্রশাসন, পুলিশ, কোস্ট গার্ড সবারই বক্তব্য, আটক সারগুলো মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছিল। প্রশাসন সার পাচার ঠেকাতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তবে সচেতন মহলের মতে, এসব অভিযানে মূলত শ্রমিক, চালক কিংবা নৌযানে থাকা ব্যক্তিরা ধরা পড়ে। এর বাইরে পুরো পাচার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কারা, কোথা থেকে চালান বের হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কারা এর আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে, তা অনেকটাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের জন্য ভোলায় বিসিআইসির বাফার গুদামে সার রাখা হয় । সেখান থেকে অনুমোদিত ডিলাররা বরাদ্দ অনুযায়ী সার উত্তোলন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ডিলার নিজেরা সরাসরি সার উত্তোলন না করে প্রতিনিধির মাধ্যমে গুদাম থেকে সার নেন। পরে সেই সার স্থানীয় কৃষকের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ডিলারের নির্ধারিত এলাকায় বিক্রয়কেন্দ্র থাকার কথা থাকলেও ভোলার অনেক এলাকায় কার্যকর গ্রামভিত্তিক বিক্রয়কেন্দ্র নেই। কোথাও শহরকেন্দ্রিক নামমাত্র দোকান থাকলেও প্রত্যন্ত এলাকার কৃষকদের সেখানে গিয়ে সার সংগ্রহ করতে হয়। এর মধ্যেই কোনো কোনো ডিলার বেশি লাভের আশায় স্থানীয় বাজারের বাইরে সার বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই সারই একপর্যায়ে কালোবাজারিদের হাত ঘুরে নদীপথে চলে যাচ্ছে মিয়ানমারের দিকে।
চরফ্যাশন উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নের বেতুয়া মাঝের ঘাটে গত ১২ আগস্ট গভীর রাতে একটি ট্রাক থেকে ফিশিংবোটে তোলার সময় ২৯৩ বস্তা ইউরিয়াসহ ট্রাক ও ফিশিংবোট জব্দ করে থানা পুলিশ। এ সময় লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আফজাল এলাকার পারভেজ হোসেন (৩৭), হাতিয়ার জাহাজমারা এলাকার সিরাজ (৫৭), নোয়াখালীর চরজব্বার উপজেলার চর কেলাক এলাকার সোহেল (২৮) ও হাতিয়ার পশ্চিম রসুলপুর এলাকার শাহারাজকে (৪০) আটক করা হয়। পরের দিন ১৩ আগস্ট জেলার উপকূলঘেঁষা নোয়াখালীর হাতিয়ার বাংলাবাজার খেয়াঘাটসংলগ্ন এলাকায় কোস্ট গার্ডের অভিযানে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ৭৬০ বস্তা সারসহ একটি ফিশিংবোট ও পাঁচজনকে আটক করা হয়। এরপর ২৩ আগস্ট চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার চর কচ্ছপিয়া ঘাটে পাচারের সন্দেহে ১৭৫ বস্তা সারসহ একটি ট্রলার আটক করে কোস্ট গার্ড। চর কুকরি-মুকরির উদ্দেশে সার নিয়ে যাওয়ার সময় ট্রলারটি আটক করা হয়। পরে উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তার উপস্থিতিতে অঙ্গীকারনামা নেওয়ার পর ট্রলার ও সারগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। সর্বশেষ ৫ সেপ্টেম্বর তজুমদ্দিনের চরমোজাম্মেল মুক্তিযোদ্ধা বাজারসংলগ্ন মেঘনা নদীতে কোস্ট গার্ডের অভিযানে জব্দ হয় ১৬০ বস্তা (৮ হাজার কেজি) ইউরিয়া সারসহ একটি স্টিলবডি ট্রলার। কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে বহনকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এর আগে ৫ মার্চ ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ফেরিঘাটে চারটি ট্রাক থেকে জব্দ করা হয় ১ হাজার ৪২০ বস্তা (প্রায় ৭১ মেট্রিক টন) সরকারি সার।
১২ আগস্টের ঘটনার বিষয়ে চরফ্যাশন থানার ওসি মাহমুদ আল ফরিদ ভূঁইয়া বলেন, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সারগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কোথায় নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। স্থানীয়রা জানান, নানা কৌশলে কয়েক ধাপে সার চোরাচালান হয়। ওই ঘাটে প্রথমে ট্রাকে নেওয়া হয়, পরে ফিশিংবোটে তোলা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে আবার নদীর মাঝখানেও নৌযান বদলের ঘটনাও ঘটে।
১৩ আগস্ট সার আটকের ঘটনায় কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, জব্দ করা সারের আনুমানিক মূল্য ৮ লাখ টাকা। সারগুলো অবৈধভাবে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে বহন করা হচ্ছিল। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
২৩ আগস্টে কচ্ছপিয়া ঘাটে আটক সার ও ট্রলার অঙ্গীকারনামা নেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হোসেন বলেন, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোস্ট গার্ড ১৭৫ বস্তা সার আটক করেছিল। বিসিআইসি সার ডিলার মেসার্স জিসান ট্রেডার্সের মালিক জাহিদ হাসানের কাছ থেকে খুচরা ডিলার মালেক গাজী চর কুকরি-মুকরির কৃষকের মধ্যে বিতরণের জন্য এসব সার সংগ্রহ করেন। পরে তিনি ট্রলার ভাড়া করে সারগুলো কুকরি-মুকরিতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে কী কারণে সারগুলো পাচারের সন্দেহে আটক করা হয়েছিল এবং পরে কোন প্রক্রিয়ায় অঙ্গীকারনামা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তজুমদ্দিনে সার ও স্টিলবডি ট্রলার আটকের বিষয়ে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, ‘এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। নৌপথে চোরাচালান ও পাচার রোধে কোস্ট গার্ড সব সময় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। পাচার রোধে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
তবে চর মোজাম্মেলে আটকের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বিসিআইসি সার ডিলার মোশাররফ হোসেন দুলাল দাবি করেছেন, সারগুলো বৈধভাবেই বিক্রি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ৪ সেপ্টেম্বর কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে প্রায় ২০০ বস্তা সার বিক্রি করা হয়। তারা একত্র হয়ে একটি স্টিলবডি বোটে করে সারগুলো নিয়ে যাচ্ছিলেন। চরের মুক্তিযোদ্ধা বাজারের ঘাট থেকে কোস্ট গার্ড সারগুলো জব্দ করে। এ বিক্রির ক্যাশ মেমো তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে বোটের শ্রমিকরা ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। তজুমদ্দিন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইব্রাহিমও জানান, উপজেলায় পাঁচজন বিসিআইসি সার ডিলার রয়েছেন। জব্দ করা ১৬০ বস্তা ইউরিয়া সার মেসার্স মোশাররফ হোসেনের কাছ থেকে চরের ১০ থেকে ১২ জন বিক্রেতা ক্যাশ মেমোর মাধ্যমে কিনেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তাই সরাসরি ডিলারকে দায়ী করার সুযোগ নেই।
তবে সচেতনমহল বলছে, বৈধ বিক্রির পর সার কোন পর্যায়ে গিয়ে পাচারের চালানে পরিণত হয়েছে, তা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় নির্ধারণের বিষয়। স্থানীয়দের দাবি, দুর্গম চরাঞ্চলের কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার সঠিকভাবে ও সময়মতো কৃষকের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে সার পরিবহন ও বিতরণ ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সার পাচারের সাম্প্রতিক এসব ঘটনা দুয়েকটি চালানে সীমাবদ্ধ নয়। ভোলার সড়ক ও নদীপথে সরকারি সারের চোরাচালানের পথ বদলেছে, নৌযান বদলেছে, পরিবহনের কৌশলও বদলেছে। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার স্থানীয় কৃষকের পরিবর্তে অন্য গন্তব্যে চলে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। ভোলার ভৌগোলিক অবস্থান এই পাচারপ্রবণতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল মেঘনা, তেঁতুলিয়া, উপকূলীয় চরাঞ্চল এবং অসংখ্য ছোট-বড় ঘাট পণ্য পরিবহনের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নজরদারির ক্ষেত্রেও কঠিন। একটি চালান স্থলপথে এসে রাতের আঁধারে নৌযানে উঠছে, এরপর নদীপথে নৌযান বদলে আরও দূরে চলে যাচ্ছে এটাই বাস্তবতা।
কৃষকের জমিতে ফসল উৎপাদনের জন্য সরকার ভর্তুকি দিয়ে যে সার সরবরাহ করে, সেটি কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি হলে একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে, অন্যদিকে সরকারি ভর্তুকির সুফলও প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। আর সেই সার যদি নদীপথে সীমান্তপারের বাজারে যাওয়ার পথে ধরা পড়ে, তাহলে বিষয়টি আর শুধু স্থানীয় বাজারের অনিয়ম থাকে না; এটি কৃষি সরবরাহব্যবস্থা ও সীমান্তপথে পণ্য পাচারের একটি বড় বাস্তবতায় পরিণত হয়।
অবশ্য কৃষি বিভাগের বক্তব্য ভিন্ন। ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক বলেন, ‘বর্তমানে ভোলায় সারের সংকট নেই। অবৈধ পথে সার পাচার রোধে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের প্রতি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’
এই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই জাতীয় পর্যায়েও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দেশে সার মজুদের ঘাটতি নেই। কিন্তু ভোলার নদীতে বারবার বড় চালান আটকের ঘটনা দেখাচ্ছে, গুদামে মজুদ থাকা আর সেই সার প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছানো দুটি এক বিষয় নয়। সার অন্যত্র নিয়ে গিয়ে কালোবাজারে বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যও খতিয়ে দেখা দরকার।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহাবুদ্দিন ফরাজী বলেন, কৃষি কর্মকর্তারা সারের সংকট নেই বললেও মাঠপর্যায়ে কৃষক সময়মতো সার পাচ্ছেন না। তার মতে, এর পেছনে সিন্ডিকেট ও পাচারকারীদের তৎপরতা রয়েছে। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার স্থানীয় বাজারে না থেকে অন্যত্র চলে গেলে প্রকৃত কৃষকই শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন।
ভোলার নদীপথে জব্দ হওয়া সার তাই শুধু কয়েকটি বস্তার হিসাব নয়। প্রতিটি চালানের সঙ্গে রয়েছে একজন কৃষকের জমি, উৎপাদন খরচ, সরকারি ভর্তুকি এবং খাদ্য উৎপাদনের স্বার্থ।
ভোলার নদীতে ট্রাক থেকে ফিশিংবোট, ফিশিংবোট থেকে বড় নৌযান, আবার স্টিলবডি ট্রলার সারের চলাচলের এই বদলে যাওয়া চিত্রই বলে দিচ্ছে, পাচারের অভিযোগ থাকা চালানগুলোতে পরিবহনের কৌশলও বদলাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চালান ধরা পড়ছে, শ্রমিক-চালক আটক হচ্ছে; কিন্তু কৃষকের বরাদ্দের সার কোন চক্রের হাত ধরে নদীপথে উঠছে, সেই পুরো সরবরাহশৃঙ্খলকে চিহ্নিত করাই এখন এই ধারাবাহিক ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।