শিক্ষক সংকটে স্থবির চারুকলা

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

চারটি সেমিস্টারের একটি সেমিস্টারের পরীক্ষা এখনো দিতে পারেনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চারুকলা অনুষদের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা। প্রায় দেড় বছর ধরে পরীক্ষার অপেক্ষায় আছেন তারা। একই শিক্ষাবর্ষের অন্য অনেক বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যেখানে শেষের দিকে, সেখানে চারুকলার শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স শেষ হয়নি। অনুষদের আটটি ডিসিপ্লিনে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান, ব্যবহারিক কাজ ও পরীক্ষায় তৈরি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা।

চারুকলা অনুষদের ৭৮টি অনুমোদিত শিক্ষক-পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২১ জন শিক্ষক। ৫৭টি শিক্ষক-পদ শূন্য। কোনো কোনো ডিসিপ্লিনে শিক্ষক আছেন মাত্র একজন বা দুজন। ব্যবহারিক কাজ-নির্ভর এ শিক্ষায় একজন শিক্ষককে একাধিক ব্যাচ ও কোর্স সামলাতে হয় বলে নিয়মিত অ্যাকাডেমিক কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে, জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। শ্রেণিকক্ষ, দরকারি সরঞ্জাম, কিলন ও স্থায়ী প্রদর্শনী গ্যালারির সংকটও রয়েছে।

দেড় বছরেও হয়নি এক সেমিস্টারের পরীক্ষা : চারুকলার ভাস্কর্য ডিসিপ্লিনের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মুনিম শাহারিয়ার জানান, তাদের ব্যাচের শিক্ষাজীবন অন্য অনেক বিভাগের তুলনায় পিছিয়ে আছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের চারটি সেমিস্টারের মধ্যে একটি সেমিস্টারের পরীক্ষা এখনো দিতে পারিনি। প্রায় দেড় বছর ধরে পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছি। একই শিক্ষাবর্ষের অন্য অনেক বিভাগের শিক্ষার্থীরা যেখানে পড়াশোনার শেষের দিকে, তখন আমাদের মাস্টার্স এখনো শেষ হয়নি।’

চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সেশনজটের মূল কারণ শিক্ষক-সংকট। পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক থাকলে সেশনজট থাকার কথা নয়।’ তিনি জানান, ব্যবহারিক ও সেশনাল কোর্সের পরীক্ষা নিয়মিত নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষকস্বল্পতার কারণে অনেক সময় পরীক্ষার কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হয়।

৭৮ পদের ৫৭টিই শূন্য : চারুকলা অনুষদের আটটি ডিসিপ্লিনে মোট ২১ জন শিক্ষক রয়েছেন চিত্রকলায় ৩ জন, প্রাচ্যকলায় ৩ জন, ছাপচিত্রে ২ জন, ভাস্কর্যে ৫ জন, মৃৎশিল্পে ১ জন, গ্রাফিক ডিজাইনে ২ জন, কারুশিল্পে ২ জন এবং শিল্পকলার ইতিহাসে ২ জন; অথচ অনুষদে অনুমোদিত শিক্ষক-পদ ৭৮টি। ৫৭টি পদ বর্তমানে শূন্য।

চারুকলার ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, চারুকলা একটি বিভাগ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এখন তিনটি বিভাগে আটটি ডিসিপ্লিন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি ডিসিপ্লিনের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ৭৮টি শিক্ষক-পদের বিপরীতে বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২১ জন। শিক্ষার্থীর অনুপাতে প্রতিটি ডিসিপ্লিনে ১৫ থেকে ১৮ জন শিক্ষক প্রয়োজন, অথচ কোনো কোনো ডিসিপ্লিনে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র একজন বা দুজন।’

ডিন জানান, চারুকলায় অনার্স চালু হয় ১৯৯৪-৯৫ শিক্ষাবর্ষে। ২০০৯ সাল নাগাদ শিক্ষকসংখ্যা ৩৫-এ পৌঁছালেও এরপর দীর্ঘ সময় তেমন নিয়োগ হয়নি। এর মধ্যে অনেকে অবসরে গেছেন, একজন শিক্ষক মৃত্যুবরণ করেছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে চারজন শিক্ষক যোগ দেওয়ায় এখন শিক্ষক ২১ জন।

একজন শিক্ষক দিয়ে একটি ডিসিপ্লিন : চারুকলার মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এ কে এম আরিফুল ইসলাম জানান, তাদের বিভাগে শিক্ষক-সংকট প্রকট। মৃৎশিল্প ডিসিপ্লিনে এখন মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন, যিনি আগামী ডিসেম্বরে অবসরে যাবেন। তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষক দিয়ে একটি ডিসিপ্লিন চালানো বাংলাদেশে সম্ভবত নজিরবিহীন ঘটনা। শিক্ষক-সংকটের কারণে পাঠদান, ব্যবহারিক কাজ সব ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য দুটি আলাদা ডিসিপ্লিন হলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে একই বিভাগের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।’ শিক্ষক-সংকটে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের চাপ : ব্যবহারিক কাজ-নির্ভর শিক্ষা হওয়ায় প্রতিটি কোর্সে শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু শিক্ষক-স্বল্পতার কারণে একই শিক্ষককে একাধিক ব্যাচ ও একাধিক কোর্স সামলাতে হচ্ছে। এতে পাঠদান ও পরীক্ষার কাজ দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে জানান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

বছরে সরঞ্জামেই ২০-৩০ হাজার টাকা : চারুকলার পড়াশোনা ব্যবহারিক-নির্ভর হওয়ায় বিভিন্ন কোর্সে প্রয়োজন হয় নানা ধরনের উপকরণ ও সরঞ্জাম। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বেশিরভাগ উপকরণ নিজেদের অর্থে কিনতে হয়। মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী নিয়াজ মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের অধিকাংশ কোর্সই ব্যবহারিক। তাত্ত্বিক পড়াশোনার উপকরণ লাইব্রেরি বা ইন্টারনেট থেকে পাওয়া গেলেও ব্যবহারিক কাজের উপকরণ শিক্ষার্থীদেরই কিনতে হয়। একটি কোর্সেই অনেক সময় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়।’ অন্তত পরীক্ষার উপকরণগুলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরবরাহ করার দাবি জানান তিনি।

মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু কিছু ব্যবহারিক কোর্সে একজন শিক্ষার্থীর ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার উপকরণ লাগতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেসব সরবরাহ করা গেলে শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সহায়তা হবে।’

ছাপচিত্র ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী আসাদ সাদিক রাফি বলেন, ‘শিক্ষক-সংকটের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংকটও রয়েছে। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ছে। আমাদের ছয়-সাতটি ব্যাচ চলমান, কিন্তু শ্রেণিকক্ষ আছে মাত্র তিনটি। ফলে একই সময়ে ক্লাস চললে অতিরিক্ত ভিড় ও শব্দ হয়। ছাপচিত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য নতুন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়নি। অ্যাসিড, কেমিক্যাল ও বিভিন্ন সরঞ্জাম শিক্ষার্থীদের নিজেদের কিনতে হয়। অনেক প্রয়োজনীয় উপকরণ রাজশাহীতে পাওয়া যায় না, বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হয়। একজন শিক্ষার্থীর বছরে শুধু সরঞ্জাম কিনতেই ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়।’

শ্রেণিকক্ষ-সংকটে বাইরে ক্লাস : চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় কখনো কখনো খোলা জায়গায়ও ক্লাস করতে হয়। একই শ্রেণিকক্ষ একাধিক ব্যাচকে ব্যবহার করতে হওয়ায় ব্যবহারিক ক্লাসের পরিবেশও ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থী নিয়াজ মাহমুদ বলেন, ‘চারুকলায় জায়গা তুলনামূলকভাবে বড় হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষ পাওয়া যায় না। কখনো বাইরে ক্লাস করতে হয়; কোনো কোনো ক্লাস বন্ধও রাখতে হয়।’

স্থায়ী প্রদর্শনী গ্যালারি নেই : শিক্ষার্থীদের তৈরি শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় অনেক সময় শ্রেণিকক্ষকেই প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। শিক্ষার্থী মুনিম শাহারিয়ার বলেন, ‘আমরা শিল্পকর্ম তৈরি করি, কিন্তু গ্যালারির সংকটের কারণে নিয়মিত বার্ষিক প্রদর্শনী আয়োজন করা সম্ভব হয় না।’

পুরনো কিলনে কাক্সিক্ষত ফল নেই : মৃৎশিল্প ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীদের বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো কিলন বা চুল্লি। বিভাগে থাকা পুরনো কিলনে মৃৎশিল্প পোড়ানোর ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পুরনো কিলনে ফায়ারিংয়ের মান ভালো হয় না। কাক্সিক্ষত গ্লেজিং পাওয়া যায় না। আধুনিক কিলনসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা দরকার।’ তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সিরামিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপে গিয়ে ভালো করছে এবং প্রশংসা পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের তৈরি পণ্য বাজারজাত করে তাদের আয়ের সুযোগ করে দেওয়া যাবে।

শিক্ষক নিয়োগের আশ্বাস : চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনুষদের সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিক। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। চলতি সংশোধিত বাজেটে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার উপকরণের জন্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দের অর্থ এখনো হাতে আসেনি। অর্থ দ্রুত ছাড়ের জন্য উপাচার্য সংশ্লিষ্ট বাজেট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘চারুকলা অনুষদের সংকটগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। অবকাঠামোগত সংকট-সমাধানে অনেক ক্ষেত্রে ইউজিসির বাজেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। আগামী বাজেটে বিশেষ বিবেচনার জন্য আমরা চেষ্টা করব। শিক্ষক-সংকটের ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব অর্গানোগ্রামে অনুমোদিত পদ অনুযায়ী নিয়োগ দিতে পারব। আশা করছি, এক-দুই মাসের মধ্যে শিক্ষক-সংকট অনেকটাই কমে আসবে। পরীক্ষার সামগ্রী কেনার জন্য ১৫ লাখ টাকার একটি স্বল্পমেয়াদি বাজেট দেওয়া হয়েছে। তবে আরও বড় বাজেট প্রয়োজন। এ বিষয়েও ইউজিসির মাধ্যমে অনুমোদন নিয়ে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীরা আরও একটু সহায়তা পেলে ভালোভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।’

দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের দাবি : চারুকলা অনুষদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে শিক্ষক-সংকটের বিষয়টি। ২১ জন শিক্ষক দিয়ে আটটি ডিসিপ্লিনের পাঠদান, ব্যবহারিক শিক্ষা, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করায় শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরাও। শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, স্থায়ী প্রদর্শনী গ্যালারি ও প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করা হলে চারুকলার সংকট অনেকটাই কাটবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত