শেখ হাসিনার ‘নীরবতাকে’ ভারত সম্মতি ধরে নেয়: ফারুক সোবহান 

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৩ পিএম

১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বন্টনের চুক্তি স্বাক্ষরের সময় পররাষ্ট্রসচিব ছিলেন প্রবীণ কূটনীতিক ফারুক সোবহান। চুক্তিটি বাংলাদেশকে ন্যূনতম সম্মত পরিমাণ পানি দেওয়ার নিশ্চয়তার জন্য ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ (নিশ্চয়তামূলক ধারা) এবং ‘আরবিট্রেশন ক্লজ’ (সালিসের ধারা) ছাড়াই স্বাক্ষর করা হয়। তার দাবি, এই দুটি ধারার বিষয়ে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নীরব ছিলেন এবং এ ‘নীরবতাকে’ সম্মতি ধরে নিয়ে ভারত ধারা দুটি যুক্ত না করেই চুক্তিটি স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত করে এবং দুই দেশ তা সই করে। 

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে অনুষ্ঠিত দুটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফারুক সোবহান এ দাবি করেন। 

বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ফরমার বিসিএস (এফএ) অ্যাম্বাসাডরস’ (এওএফএ) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।  

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছরের জন্য স্বাক্ষর হওয়া চুক্তিটির মেয়াদ আগামী ১১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। তদানীন্তন দুই প্রধানমন্ত্রী—বাংলাদেশের শেখ হাসিনার এবং ভারতের দেব গৌড়া নয়াদিল্লিতে চুক্তিটি সই করেন। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হ্ওয়ার দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, দুই দেশে এ বিষয়ে বিভিন্ন মহল ভবিষ্যতের চুক্তির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। 

আলোচনায় অংশ নিয়ে ফারুক সোবহান জানান, চুক্তিটি সইয়ের সময় তিনি পররাষ্ট্রসচিব ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন যথাক্রমে আবদুস সামাদ আজাদ ও আবুল হাসান চৌধুরী। 

তিনি জানান, খসড়া তৈরির পর্যায়ে দরকষাকষির সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রতি প্রাথমিক নির্দেশনা ছিলো যে, চুক্তিটি ১৯৭৭ সালের চুক্তির চেয়ে তুলনামূলকভাবে ভালো হতে হবে এবং তাতে পানি পাওয়ার বিষয়ে একটি ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ (নিশ্চয়তামূলক ধারা) এবং ‘আরবিট্রেশন ক্লজ’ (সালিসের ধারা) থাকতে হবে। চূড়ান্ত খসড়া পাওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রসচিব একসঙ্গে বসে পরীক্ষা করে দেখেন যে তাতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ও ‘আরবিট্রেশন ক্লজ’। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি ঢাকাতেই তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আনা হয় এবং তাকে বলা হয়, খসড়াটি গ্রহণযোগ্য নয়; কারণ তাতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ও ‘আরবিট্রেশন ক্লজ’ নেই। এ দুটি না থাকলে তিনি চুক্তিটি সইয়ের জন্য দিল্লি যেতে পারেন না। কিন্তু শেখ হাসিনা জানান, তিনি দিল্লি যাবেন এবং সেখানে গিয়ে সব ঠিক করবেন।

বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল দিল্লিতে পৌঁছানোর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইকে গুজরাল বললেন, যদি তিনি (হাসিনা) সম্মতি দেন তাহলে (পরদিন) স্বাক্ষরের জন্য চুক্তিটি প্রিন্ট করা যেতে পারে। ফারুক সোবহানের দাবি, প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনার) তখন চুপ ছিলেন। ‘কিছু একটা বলার জন্য’ পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে তিনি (ফারুক সোবহান) অনুরোধ করলে শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রসচিবকে ‘কিছু বলতে’ নির্দেশ দেন। 

ফারুক সোবহান জানান, তিনি কিছুটা বেকায়দা অবস্থা থেকে চুক্তির খসড়ায় ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ও ‘আরবিট্রেশন ক্লজ’ অন্তর্ভূক্ত না থাকার কথা তুললে আইকে গুজরাল নিজের হাত ছুড়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং বলেন, ‘আমরা সবকিছু চূড়ান্ত করে ফেলেছি; এখন শেষ মুহুর্তে এসে তোমরা আমলারা ঝামেলা পাকাচ্ছ।’ গুজরাল চুক্তির খসড়া যে অবস্থায় ছিল (‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ও ‘আরবিট্রেশন ক্লজ’ ছাড়া) সেই অবস্থায়ই স্বাক্ষরের জন্য প্রিন্ট করার বিষয়ে আবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মতামত চাইলে তিনি (হাসিনার) তখনও নীরবতা অবলম্বন করেন। 

ফারুক সোবহান দাবি করেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নীরবতাকে সম্মতি ধরে নিয়ে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটির প্রিন্ট নেওয়া হয় এবং পরদিন (১২ ডিসেম্বর) তা (‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ও ‘আরবিট্রেশন ক্লজ’ ছাড়া) স্বাক্ষর করা হয়। 

ফারুক সোবহান বলেন, ভারতীয়রা পরবর্তীতে একান্ত আলোচনায় বাংলাদেশে গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

বাংলাদেশ সরকার ভবিষ্যতে দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গঙ্গার পানিচুক্তি সম্পাদনে সফল হবে, এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে ফারুক সোবহান বলেন, শেষ পর্যন্ত কী হয়, সেটা দেখার জন্য তিনি অপেক্ষায় থাকবেন।  

শনিবার প্রকাশিত ‘সেরেন্ডিপিটি ইন ডিপ্লোম্যাসি বিটুইন প্রটোকল অ্যান্ড পলিটিক্স - অ্যা মেমোয়ার’ বইটির লেখক সাবেক রাষ্ট্রদুত মাহমুদ হাসান। মহানবী হযরত মুহাম্মদের (স) জীবনীভিত্তিক ‘ইন সার্চ অব অ্যা রোল মডেল’ বইয়ের লেখক সাবেক রাষ্ট্রদূত এম ফজলুল করিম।  

এওএফএ প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ আল-হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব হেমায়েত উদ্দিন, সাবেক ছয় রাষ্ট্রদূত শাহেদ আখতার, গোলাম মোহাম্মদ, মুহাম্মদ ইমরান, মাশফি বিনতে শামস, মো. শামীম আহসান ও এএফএম গওসল আজম সরকার।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত