জঙ্গলের আড়ালে ৩শ বছরের মসজিদ!

ছাদ নেই, গম্বুজের চিহ্নও নেই; দেয়াল আঁকড়ে ধরেছে গাছের শিকড়। জঙ্গল আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে প্রায় তিন শত বছরের পুরোনো ‘আবদালের মসজিদ’।

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৩ এএম

নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের চকমাহাপুর গ্রামের একটি নীরব স্থাপনা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘আবদালের মসজিদ’ নামে। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো বলে পরিচিত এই মসজিদটি দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে এখন বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহাসিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে।

একসময় যেখানে আজানের ধ্বনি শোনা যেত, সেখানে এখন ঝোপঝাড়ে ঢেকে আছে ভাঙা ইটের দেয়াল। কোথাও পুরোনো ইটের গাঁথুনি, কোথাও লতাপাতা ও ফুলের কারুকাজের চিহ্ন। মসজিদের ভেতর জন্ম নেওয়া বড় একটি গাছের শিকড়ও ঢুকে পড়েছে দেয়ালের গাঁথুনিতে। দীর্ঘদিন ছাদহীন থাকায় বৃষ্টি, রোদ ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের প্রভাবও পড়েছে স্থাপনাটিতে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে মসজিদটি সংরক্ষণে সরকারি বা প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে একদিকে জঙ্গল ও গাছের শিকড়ে দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে পুরোনো ইট ও স্থাপনার বিভিন্ন অংশ হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের দাবি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত মসজিদটির জরিপ ও গবেষণা করা হোক। পাশাপাশি ঐতিহাসিক ভিটার সীমানা নির্ধারণ, জঙ্গল পরিষ্কার এবং প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যসচেতনদের মতে, আবদালের মসজিদের গুরুত্ব শুধু একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাগাতিপাড়ার নদীকেন্দ্রিক জনপদ, ঝিনুক-শামুক থেকে চুন তৈরির প্রাচীন শিল্প, স্থানীয় অর্থনীতি এবং প্রায় হারিয়ে যাওয়া আবদাল সম্প্রদায়ের জীবন ও পেশার ইতিহাস।

লোকমুখে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, একসময় পদ্মার শাখা বড়াল নদ থেকে উৎপন্ন একটি নদী এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। ওই নদী স্থানীয় যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনীতি ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল। নদীতে প্রচুর ঝিনুক ও শামুক পাওয়া যেত। সেগুলো পুড়িয়ে তৈরি করা হতো চুন। তৎকালীন দালানকোঠার গাঁথুনি, প্লাস্টার ও অলংকরণে চুন ছিল গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণসামগ্রী।

এই চুন উৎপাদনকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে একটি বিশেষ পেশাভিত্তিক মুসলিম জনগোষ্ঠী—আবদাল সম্প্রদায়। ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণাকারী অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা আজিজুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ বছর আগে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর শাসনামলে চকমাহাপুর গ্রামের নদীতীরে আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন মসজিদটি নির্মাণ করেন।

আজিজুর রহমানের মতে, সে সময় চুনশিল্প ছিল এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সেই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরাই ধর্মীয় প্রয়োজন মেটাতে মসজিদটি নির্মাণ করেন। স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণকৌশলের দিক থেকেও এটি তৎকালীন গ্রামীণ স্থাপত্যের একটি ব্যতিক্রমী নিদর্শন ছিল। পরে স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘আবদালের মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়।

অযত্নে অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে আবদালর মসজিদের পুরোনো স্থাপনা। ছবিটি বাগতিপাড়ার ১নং পাঁকা ইউনিয়নের চক মাহাপুর এলাকা থেকে তোলা হয়েছে। ছবি: দেশ রূপান্তর

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় মসজিদের পুরো জায়গাটি আশপাশের সমতল ভূমির তুলনায় অনেক উঁচু একটি ভিটা ছিল। সেখানে আবদাল সম্প্রদায়ের বসতভিটা ছিল এবং কিছু স্থাপনা মাটির নিচে দেবে যাওয়ার কথাও জানা যায়। পরে আশপাশের জমিতে চাষাবাদের জন্য মাটি কেটে সমতল করা হলে ঐতিহাসিক ভিটার উচ্চতা আগের তুলনায় অনেকটা কমে যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় মসজিদের আশপাশে আরও অনেক পুরোনো স্থাপনা ও ইট ছড়িয়ে ছিল। সময়ের সঙ্গে সেগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। জমির মালিকরা সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। আবার বিভিন্ন সময় স্থানীয় লোকজনও পুরোনো ইট নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি পাশের একটি নতুন মসজিদের প্রাচীর নির্মাণেও পুরোনো ইট ব্যবহার করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

বর্তমানে মসজিদের আশপাশের জমিগুলো যাঁরা ভোগদখল করছেন, স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষ এলাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় এসব জমি তাঁদের পূর্বপুরুষদের কাছে হস্তান্তর করে গিয়েছিলেন।

কালের পরিক্রমায় নদীটি ভরাট হয়ে গেলে ঝিনুক ও শামুকের প্রাপ্যতাও কমে যায়। একসময় বন্ধ হয়ে যায় ঐতিহ্যবাহী চুন উৎপাদন। জীবিকার তাগিদে আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষ বিভিন্ন পেশায় ছড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান। তাঁদের চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে তাঁদের নির্মিত মসজিদটিও।

সরেজমিনে দেখা যায়, চকমাহাপুর থেকে বাঘা ও আড়ানীর দিকে যাওয়ার পথে মূল সড়কের ডান পাশে একটি সরু রাস্তা চলে গেছে। সেখান থেকে পশ্চিম দিকে প্রায় ২০০ গজ এগোলেই জঙ্গলের আড়ালে চোখে পড়ে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ। প্রায় ১৯ শতক জমির উঁচু ভিটার একটি অংশে এখনো দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপনাটির অবশিষ্ট দেয়াল।

মসজিদের চারপাশ খেজুর, ভেন্না ও বিভিন্ন ধরনের ঝোপঝাড়ে প্রায় ঢেকে গেছে। মানুষের চলাচলও খুব কম। স্থানীয়রা জানান, সাপ-পোকামাকড়ের ভয়ে অনেকেই এখন সেখানে যেতে চান না।

মসজিদের অবশিষ্ট স্থাপনাটি আনুমানিক ১০ ফুট লম্বা ও ১২ ফুট প্রশস্ত। মাটি থেকে দেয়ালগুলোর বর্তমান উচ্চতা প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট। দেয়ালের পুরুত্ব আনুমানিক দেড় ফুট। ছোট ছোট পুরোনো ইট ও সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত দেয়ালগুলো এখনো অতীতের নির্মাণশৈলীর সাক্ষ্য বহন করছে।

মসজিদের দরজাগুলোও স্থাপনাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দরজাগুলো অনেকটা ইংরেজি ‘ইউ’ আকৃতির। দরজার গাঁথুনি আনুমানিক দুই ফুট পুরু। প্রতিটি দরজার ভেতরে প্রায় চার ফুট ফাঁকা জায়গা রয়েছে, যেখান দিয়ে প্রবেশ করা যায়। দরজার গাঁথুনিতে পুরোনো আমলের ইটের প্রায় পাঁচটি করে স্তর বা সারির চিহ্নও দেখা যায়।

মসজিদের পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালে এখনো লতাপাতা ও ফুলের হাতের কাজের মতো প্রাচীন কারুকাজের চিহ্ন রয়েছে। প্রাচীন নকশায় নির্মিত প্রায় পাঁচটি দরজার চিহ্নও দেখা যায়। দেয়ালের গায়ে এক-দুটি নকশাও এখনো বিদ্যমান। এসব নির্মাণশৈলীতে তৎকালীন কারিগরি দক্ষতার ছাপ রয়েছে।

মসজিদের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে একটি বড় গাছ। এর শিকড় ধীরে ধীরে দেয়ালের গাঁথুনির ভেতরে ঢুকে স্থাপনাটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দীর্ঘদিন ছাদহীন অবস্থায় পড়ে থাকায় প্রাকৃতিক ক্ষয়ও স্থাপনাটির অবস্থা আরও নাজুক করে তুলেছে।

বর্তমান ভোগদখলকারী পরিবারের সদস্য মোস্তাক মণ্ডল জানান, একসময় ওই এলাকায় আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করতেন। তাঁদের কাছ থেকেই তাঁর পূর্বপুরুষেরা এই সম্পত্তির মালিকানা পান। প্রায় ১৯ শতক জমির পুরোনো ভিটার ওপরই আবদালের মসজিদটি রয়েছে। একসময় মসজিদের আশপাশে কয়েকটি বাড়িঘর থাকলেও সেগুলো পরে ভেঙে ফেলা হয়েছে। কিছু স্থাপনা মাটির নিচেও দেবে গেছে।

মোস্তাক মণ্ডল আরও জানান, পুরোনো মসজিদটি এখন তাঁদের কাছে আবেগ ও পূর্বপুরুষদের স্মৃতির অংশ। সরকার যদি মসজিদটি সংস্কার করে কিংবা ঐতিহাসিক পুরোনো স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়, তাতে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই।

স্থানীয় প্রবীণ আলহাজ তছির উদ্দিন বলেন, তাঁর বয়স প্রায় ১০০ বছরের কাছাকাছি। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভিটাটিকে এমন অবস্থায় দেখে আসছেন। তাঁর জানা মতে, তাঁদের বাপ-দাদার সময়েরও আগে থেকে এখানে আবদালের মসজিদটি রয়েছে। প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মসজিদটি ওই স্থানে আছে বলেও তিনি জানান।

তাঁর ভাষ্য, আগে মসজিদের চারপাশে আরও অনেক পুরোনো স্থাপনা ও ইটের প্রাচীর ছিল। পরে মানুষ সেগুলো নিয়ে গেছে। এখন শুধু অবশিষ্ট দেয়ালগুলোই অতীতের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

স্থানীয় নাজিম উদ্দিন বলেন, স্থাপনাটি একসময় আরও অনেক উঁচু ছিল। চাষাবাদের কারণে ধীরে ধীরে সেটি নিচু হয়ে গেছে। জঙ্গলের কারণে এখন সহজে কেউ ভেতরে ঢোকে না। বিশেষ করে সাপ-পোকামাকড়ের ভয়ে মানুষ জায়গাটি এড়িয়ে চলে। অথচ এই স্থানটি গ্রামের বহু পুরোনো ইতিহাস বহন করছে।

পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, আবদালের মসজিদটি তাঁদের এলাকার একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। বিষয়টি নিয়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবেন। অন্তত জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করবেন। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষকেও এ ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুল ইসলাম বলেন, আবদালের মসজিদটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

যথাযথ গবেষণা, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও সংরক্ষণ করা গেলে আবদালের মসজিদ বাগাতিপাড়ার ইতিহাস-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে নতুন পরিচিতি পেতে পারে। তা না হলে কয়েক শতকের ইতিহাস বহনকারী এই স্থাপনাটির অবশিষ্ট দেয়ালগুলোও একদিন মাটিতে মিশে যেতে পারে। তখন আবদাল সম্প্রদায়, তাদের চুনশিল্প এবং এই মসজিদের ইতিহাস হয়তো শুধু স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত লোককথা হিসেবেই টিকে থাকবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত