জমি আছে, ভবন আছে; শুধু নেই শিক্ষার সুযোগ!

  • স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি সুন্দরবনসংলগ্ন পাতাখালী গ্রামে; মাইলের পর মাইল হেঁটে স্কুলে যেতে গিয়ে মাঝপথেই নিভে যাচ্ছে শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ স্বপ্নের সলতে।
আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৯ এএম

সুন্দরবনের কোলঘেঁষা খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের একটি গ্রাম পাতাখালী। প্রায় চার হাজার মানুষের বসবাস এই গ্রামে। অথচ স্বাধীনতার অর্ধশতক পরও সেখানে গড়ে ওঠেনি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারের প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করার নানা উদ্যোগ, নতুন বিদ্যালয় নির্মাণ এবং ঝরে পড়া রোধে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলেও সুন্দরবনসংলগ্ন এই গ্রামের বাসিন্দারা সেই সুবিধার বাইরেই রয়ে গেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ তিন দশক ধরে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন-নিবেদন করেও তারা কেবল আশ্বাসই পেয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে গ্রামের শিক্ষানুরাগীরা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ৩৩ শতক জমি দান করেন। পরে ২০০১ সালে সেখানে একটি কমিউনিটি স্কুল ভবন নির্মিত হলেও প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যালয়টি আর চালু হয়নি। বর্তমানে ভবনটি পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে নেই কোনো শিক্ষক, নেই পাঠদান, নেই কোনো সরকারি তদারকি।

সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই বিচ্ছিন্ন গ্রামটির শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ আজও অত্যন্ত সীমিত। গ্রামের পশ্চিমে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দক্ষিণ বেদকাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আর উত্তরে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে বীণাপাণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ছাড়া নিকটবর্তী আংটিহারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে প্রায় ৮ কিলোমিটার এবং জোড়শিং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে সাড়ে ৭ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। দীর্ঘ এই পথ, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে অনেক শিশুর পক্ষে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।

গ্রামের প্রায় ৪ শতাধিক শিক্ষার্থী দক্ষিণ বেদকাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চোরামুখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ দূরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এলাকাটিতে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয় এবং নদী-খাল পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে গিয়ে শিশুদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হার উল্লেখযোগ্য হলেও উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকায় বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর সমস্যা এখনো শিক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যালয় থেকে দূরত্ব বেড়ে গেলে শিক্ষার্থীর মাঝপথে ঝরে পড়ার ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়।

পাতাখালী গ্রামের শিক্ষার্থী ফাইসাল ও খাদিজা খাতুন জানায়, প্রতিদিন অনেক দূরে হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এতে তাদের প্রচুর সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শারীরিক ক্লান্তিও বেড়ে যায়। তাদের অনেক বন্ধু এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। তারা নিজেদের গ্রামেই একটি সরকারি বিদ্যালয় চায়।

বিদ্যালয়ের জন্য জমিদাতা হায়দার মল্লিক আক্ষেপ করে বলেন, গ্রামের শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তাঁরা ৩৩ শতক জমি দান করেছিলেন। কিন্তু ৩০ বছর পার হয়ে গেলেও বিদ্যালয় চালু হয়নি। বিভিন্ন দপ্তরে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখেননি। জীবদ্দশায় গ্রামের শিশুদের জন্য অন্তত একটি বিদ্যালয় দেখে যেতে চান তাঁরা।

বিদ্যালয় তৈরির সাথে জড়িত হরপ্রসাদ মণ্ডল হিমেল বলেন, গ্রামের শিশুদের কথা বিবেচনা করে একসময় একটি বিদ্যালয় চালু করা হয়েছিল। তিনি টানা ৩ বছর শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়িয়েছেন। তবে বিদ্যালয়টি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা বন্ধ হয়ে যায়।

হিমেল আরও বলেন, বিদ্যালয় দূরে হওয়ায় পথের কষ্ট এবং পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে অনেক শিশু পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। এতে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বাল্যবিবাহের ঝুঁকিও বাড়ছে। গ্রামের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তপন কুমার কর্মকার বলেন, পাতাখালী গ্রামে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রয়োজন রয়েছে। আগে সেখানে একটি কমিউনিটি স্কুল ছিল, তবে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যালয়টি আর চালু হয়নি। অতীতে সেখানে নতুন বিদ্যালয় নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হলেও সেটি অনুমোদন পায়নি। এখন নতুন করে আবারও প্রস্তাব পাঠাতে হবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাতাখালী গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই- এ বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তবে বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত