৩০ নৌকার ১২টিই সিংগাইরের

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২০ এএম

মানিকগঞ্জে সক্রিয় ৩০টি নৌকাবাইচ নৌকার মধ্যে ১২টিই সিংগাইরের। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও ব্যস্ত জীবনে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন কমে এলেও, এ উপজেলার নৌকা মালিক ও মাঝিমাল্লারা এখনো এই লোকজ ক্রীড়ার চর্চা ধরে রেখেছেন। প্রতি বছর কালীগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীতে নৌকাবাইচের আসরে সিংগাইরের নৌকাগুলো অংশ নিয়ে নানা পুরস্কার জিতে নেয়। তবে বর্তমানে নৌকা তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগীদের মধ্যে নানা বিশৃঙ্খলার কারণে শত বছরের এই লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় নৌকা মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলায় সক্রিয় বাইচের নৌকা রয়েছে ৩০টি। এর মধ্যে সিংগাইরেই রয়েছে ১২টি, যা জেলার মোট সক্রিয় নৌকার প্রায় অর্ধেক। হরিরামপুরে ৯টি, সদর উপজেলায় ৩টি, শিবালয়ে ৩টি, সাটুরিয়ায় ২টি এবং ঘিওরে রয়েছে ১টি বাইচের নৌকা। ফলে মানিকগঞ্জের নৌকাবাইচের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে সিংগাইরের অবস্থান এখনো শক্ত। জেলার দৌলতপুর উপজেলায় বিভিন্ন সময়ে নৌকাবাইচের আয়োজন হলেও স্থানীয় নৌকা মালিকদের দেওয়া বর্তমান তথ্য অনুযায়ী সেখানে সক্রিয় বাইচের নৌকা নেই।

সিংগাইরের জামশা এলাকায় কালীগঙ্গা নদী, চান্দহর ও ধলেশ্বরী নদীতে প্রতি বছরই নৌকাবাইচের আয়োজন হয়। এসব আয়োজনে স্থানীয় নৌকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকার নৌকাও অংশ নেয়। হরিরামপুরের সাপাই দিয়াবাড়ী বিল ও ইছামতি নদী, সদর উপজেলার বেউথা এলাকার কালীগঙ্গা নদী, দৌলতপুরের সমেতপুর গ্রামের ইছামতি নদী এবং ঘিওরের জাবরা এলাকার ইছামতি নদীতেও বিভিন্ন সময়ে বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। ঘিওরের হেলাচিয়া গ্রামের ইছামতি নদীতেও দীর্ঘদিন ধরে এই আয়োজন চলে আসছে।

নৌকাবাইচের জন্য সাধারণত সরু, লম্বা ও দ্রুতগতির কাঠের নৌকা ব্যবহার করা হয়। স্থানীয়ভাবে এসব নৌকার আকার ও ধরনে রয়েছে ভিন্নতা। কোনো কোনো নৌকা ৪৫ থেকে ১০০ হাত পর্যন্ত দীর্ঘ। বড় নৌকায় ৭০ থেকে ১০০ জন বা তারও বেশি মাঝি বৈঠা চালান। ছোট ও মাঝারি নৌকায় অংশ নেন ২৫ থেকে ৬০ জন মাঝি। তাদের সঙ্গে থাকেন সারেং, হালধর, তালদাতা ও অন্যান্য সহকারী।

বাইচের নৌকাগুলোরও রয়েছে আলাদা পরিচয় ও নাম। সিংগাইরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ‘প্রবাসী বলধারা’, ‘বলধারার ঐতিহ্য’, ‘রাজহংস’, ‘বাইমাইল একতা এক্সপ্রেস’, ‘উরিয়া বাজ’, ‘হাতনি রাজ’, ‘হাজারী তরী’, ‘কালাম সিকদার’, ‘গোবিন্দল কসাই বাড়ি’, ‘মোল্লা বাড়ি’ ও ‘নকিব বাড়ী একতা এক্সপ্রেস’ নামের নৌকা রয়েছে। নৌকা মালিকরা অনেক সময় পারিবারিক ঐতিহ্য, স্থানীয় পরিচিতি কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী নৌকার নাম দেন।

সাধারণত আষাঢ় থেকে আশ্বিন পর্যন্ত চলে নৌকাবাইচের মৌসুম। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীতে চলে প্রতিযোগিতা। বাইচের দিন নদীর দুই তীরে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক দর্শক। কোথাও কোথাও বাইচকে কেন্দ্র করে বসে মেলা। এতে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানিদের বেচাকেনাও বাড়ে।

একসময় নৌকাবাইচের বিজয়ী দলকে গরু, খাসি, ধান কিংবা ট্রফি পুরস্কার দেওয়ার প্রচলন ছিল। এখন নগদ অর্থের পাশাপাশি মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন, আলমারি, ক্রেস্টসহ বিভিন্ন পুরস্কার দেওয়া হয়। বড় আয়োজনগুলোতে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।

সিংগাইরের ‘উরিয়া বাজ’ নৌকার মালিক আলী আকবর বলেন, ‘একটি বাইচের নৌকা তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়। তারপরও ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য আমরা নৌকা সংরক্ষণ করছি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে নতুন প্রজন্মকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে।’

মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘নৌকাবাইচ আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত