কার্লো আনচেলত্তি বিশ্বের সবচেয়ে সফল কোচদের অন্যতম। তিনি রেকর্ড রেকর্ডসংখ্যক পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জয়ের পাশাপাশি ইউরোপের সেরা পাঁচটি লিগের প্রতিটিতেই ট্রফি জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। এবার তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি হাতে নিয়েছেন: ব্রাজিলকে আবারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করে তোলা। এমন অভিজ্ঞতা ও খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের জন্যও বিশ্বের সবচেয়ে সফল দলটিকে সামলানো সহজ হয়নি—যার প্রমাণ বিশ্বকাপে তাঁদের নকআউট পর্বের প্রথম ধাপ থেকেই বিদায় নেওয়া। ইতালিয়ান এই কৌশলবিদ এখন একঝাঁক নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়কে নিয়ে দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছেন। কলকাতায় ভারতের বিপক্ষে বহুল প্রতিক্ষিত আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের আগে, ব্রিসবেনে থেকে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া'রকে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিগ কার্লো।
ব্রাজিল বর্তমানে বিশ্ব র্যাংকিংয়ের ৫ম স্থানে, ভারতের অবস্থান ১৩৮। সম্ভবত এটি আপনার দল মুখোমুখি হতে যাওয়া সর্বনিম্ন র্যাঙ্কিংয়ের কোনো দল। এই প্রীতি ম্যাচটি নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
কার্লো আনচেলত্তি: বিশ্বের প্রতিটি কোণেই ব্রাজিলের সমর্থক রয়েছে। এই জাতীয় দলের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে খেলতে যাওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের—কেবল ব্রাজিলীয় সমর্থকদের জন্যই নয়, ভারতের ফুটবলপ্রেমীদের জন্যও। এটি একটি প্রস্তুতির ম্যাচ, একটি প্রীতি ম্যাচ, কিন্তু আমাদের কাছে কোনো ম্যাচই প্রীতি ম্যাচ নয়। জাতীয় দলের হয়ে যখন আপনি খেলবেন, আপনাকে সর্বদা নিজের সেরাটা দিতে হবে। আমরা একটি নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড় তৈরির কাজ করছি। গত বিশ্বকাপ থেকে তৈরি হওয়া একটা শক্ত ভিত্তি আমাদের আছে। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য ২০২৮ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নেওয়া।
আনচেলত্তি: আমাদের অন্যান্য দেশ এবং তাদের ফুটবল সংস্কৃতি দেখতে হবে। আমরা ভিন্ন ভিন্ন ধারার ফুটবলের বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচ খেলতে অভ্যস্ত। ভারতের মুখোমুখি হওয়াটা রোমাঞ্চকর হবে। এটা সত্য যে বিশ্বমানের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলার অভিজ্ঞতা ভারতের খুব একটা নেই, তবে তারা কেমন খেলে সেটা আমাদের জেনে নেওয়া প্রয়োজন। আমি আগে কখনো ভারতে যাইনি, তাই কলকাতা যাওয়ার কথা ভেবে আমি সত্যিই খুব রোমাঞ্চিত।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হওয়া সত্ত্বেও ফুটবলে ভারতের এই পিছিয়ে থাকা র্যাঙ্কিং কি আপনাকে অবাক করে?
আনচেলত্তি: আমি মনে করি এটি সংস্কৃতির একটি বিষয়। ভারতে ফুটবলের সেই সংস্কৃতিটা গড়ে ওঠেনি, তবে অন্যান্য খেলায় তারা বেশ ভালো করছে। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড় তৈরি করতে হলে এ বিষয়ের ওপর কাজ করতে হবে।
ব্রাজিল এখন অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং সিঙ্গাপুরের মতো তুলনামূলকভাবে দুর্বল দলের বিরুদ্ধে খেলছে। এই প্রীতি ম্যাচগুলো থেকে ব্রাজিলের অর্জন কী?
আনচেলত্তি: প্রীতি ম্যাচগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন খেলোয়াড়দের পরখ করে দেখা। আমার লক্ষ্য হলো যেসব খেলোয়াড়কে আমি খুব ভালোভাবে চিনি না, তাদের কাছ থেকে পারফরম্যান্স দেখা। এটি প্রতিযোগিতামূলক আসরগুলোর জন্য চূড়ান্ত দল নির্বাচনের সময় আমাকে সাহায্য করবে। আমাদের একটি অসাধারণ প্রজন্ম ছিল যারা ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে খেলেছে। এখন আমাদের কাজ হলো সেই প্রজন্মের বিকল্প তৈরি করা।
ইউরোপ থেকে ওশেনিয়া, তারপর এশিয়ার এই দীর্ঘ আন্তঃমহাদেশীয় ভ্রমণের কারণে কি কিছু তারকা খেলোয়াড় বিশ্রামের আবেদন করেছেন?
আনচেলত্তি: অস্ট্রেলিয়ায় আসা খেলোয়াড়দের প্রত্যেকেই এত দীর্ঘ ফ্লাইটের পরেও এখানে আসতে পেরে বেশ আনন্দিত। কোনো খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দেওয়া নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আমি কখনোই কোনো ব্রাজিলীয় খেলোয়াড়কে জাতীয় দলের হয়ে না খেলার অনুরোধ করতে শুনিনি। সব খেলোয়াড়কেই পাওয়া যাবে।
প্রীতি ম্যাচের জন্য ঘোষিত ২৬ জনের প্রাথমিক দলে ১০ জন স্থানীয় লিগের খেলোয়াড়, দুজন কিশোর, চারজন ২০ বছর বয়সী এবং আরও তিনজন ২৩ বছরের কম বয়সী খেলোয়াড় রয়েছেন। এটি কি ব্রাজিলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো নতুন প্রতিভা খোঁজার কোনো পরিকল্পিত পদক্ষেপ?
আনচেলত্তি: আমাদের মার্কিনহোস, গ্যাব্রিয়েল (মাগালাস), ব্রুনো (গিমারেস), রাফিনহা এবং ভিনিসিয়ুসের (জুনিয়র) মতো খেলোয়াড়দের একটি শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। আমরা এদেরকে কেন্দ্র করেই একঝাঁক নতুন তরুণ খেলোয়াড় নিয়ে নতুন একটি দল গঠন করতে চাই। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল সবসময় নতুন নতুন দূরন্ত সব প্রতিভা উপহার দেয়। এটা সত্য যে আমাদের কিছু তরুণ খেলোয়াড় এই মুহূর্তে ক্লাব পর্যায়ে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাচ্ছে না, তবে জাতীয় দলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাদের মানোন্নয়ন এবং বেড়ে ওঠার সুযোগ আমরা তৈরি করে দেব।
প্রকাণ্ড এই প্রতিভা সংগ্রহের ভাণ্ডার থেকে জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় বাছাই করা কতটা কঠিন?
আনচেলত্তি: এটি সত্যিই কঠিন, কারণ দলে জায়গা পাওয়ার প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। প্রতি সপ্তাহান্তে আমরা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করি যারা জাতীয় দলের অংশ হতে পারে। আমরা সব জায়গায় নজর রাখছি; ইউরোপ, রাশিয়া, সৌদি আরবের লিগের ম্যাচগুলো দেখছি। ব্রাজিলীয় খেলোয়াড়রা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সর্বত্র, এবং তাদের সবার ভেতরেই অসাধারণ মান রয়েছে।
আপনার অধীনে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভিনিসিয়ুস একজন ট্রাম্পকার্ড খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছিলেন। রিয়াল মাদ্রিদ থেকে আপনার বিদায়ের পর তাকে আর আগের ফর্মে দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
আনচেলত্তি: হতে পারে এটি তার সেরা সময় যাচ্ছে না, তবে উদাহরণস্বরূপ—বিশ্বকাপে সে আমাদের হয়ে বেশ ভালো খেলেছে। একজন খেলোয়াড় সব সময় তার ফর্মে ১০০% থাকতে পারে না। ভিনিসিয়ুসের যে মান রয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। সে একজন অসাধারণ খেলোয়াড়, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা। আমি নিশ্চিত যে আগামী ম্যাচগুলোতে সে আবার তার সেরা ফর্মে ফিরে আসবে।
অস্ট্রেলিয়ায় ব্রাজিলের প্রথম অনুশীলন সেশন, গাছে চড়ে দেখল সমর্থকরা