বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পিডি নিয়োগের প্রস্তাব

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩১ এএম

হঠাৎ করেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) আওতায় বাস্তবায়নাধীন ১১টি প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তনের উদ্যোগ ঘিরে কৃষি বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ে তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। প্রকল্পগুলোতে নতুন পরিচালকের একাধিক নাম সুপারিশ করে সম্প্রতি একটি তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতগুলো পরিচালক একসঙ্গে পরিবর্তন এবং কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নাম যুক্ত থাকায় এ তালিকা নিয়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে চলছে অসন্তোষ। এ পরিস্থিতিতে কৃষিমন্ত্রীও তালিকাটি দেখে তা আপতত বাস্তবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, ডিএই থেকে পাঠানো তালিকায় একসঙ্গে পার্টনার, কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষিপ্রযুুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, স্মলহোল্ডার কম্পিটিটিভনেস, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন, ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্পসারণ প্রকল্প, কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং বিল্ডিং ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস ইন ভালনারেবল ল্যান্ডস্ক্যাপস ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক (পিডি) আব্দুল কায়ূম মজুমদার। তাকে বদলি করে তার স্থলে বান্দরবনে দায়িত্বরত অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আব্দুল গফফারকে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ এই কর্মকর্তা ২০১৭ সালে আর্থিক অনিয়মের কারণে শাস্তি পেয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তিনি ওই আবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তো করেনইনি বরং তার বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষর জাল করে দাখিল করেন। এ ধরনের কর্মকর্তার তালিকায় স্থান পাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচার কম্পিটিভনেস প্রকল্পের ডিএই উইংয়ের পরিচালকের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আবুল বাসার মিয়ার নাম। তিনি এই প্রকল্পে বর্তমানে যিনি মনিটরিং অফিসার এবং উপপ্রকল্প পরিচালক রয়েছেন তাদের জুনিয়র। তিনি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং বিগত সময়ে তার নানা-নানি ছিলেন ওই দলের সংসদ সদস্য।

মাশরুম প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অফিসার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতে থাকা মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে কাজুবাদাম ও কফি গবেষণার পিডি নিয়োগের তালিকায় এক নম্বরে সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি বদলি করে রংপুরে পাঠানো হলেও মো. আকলিমুজ্জামানকে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি পদে বদলির সুপারিশ করা হয়েছে। ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার প্রকল্পের পিডি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আরেক প্রকল্পে কর্মরত ডিপিডি এমএম আব্দুর রাজ্জাকের নাম সুপারিশ করা হয়েছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর থেকেই পিডি পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি বড় বাণিজ্য করার চেষ্টা করছিলেন অ্যাগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (অ্যাব) কতিপয় নেতা। এরা খামারবাড়িতে বদলিবাণিজ্য, কর্মকর্তাদের মারধরসহ নানাভাবে ডিএইতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে রেখেছেন। বড় অংকের লেনদেনের মাধ্যমে তারা এর আগে একাধিকবার অ্যাবের নাম ব্যবহার করে মন্ত্রণালয়ে পিডি পরিবর্তনের তালিকা প্রদান করেন বলে যেখানে অভিযোগ রয়েছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো অবগত এবং কৃষিমন্ত্রী এ তালিকা বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখাননি বলেই জানা গেছে।

এবারে নেতাদের এই অংশটি ডিএইর পক্ষ থেকে দাপ্তরিক পদ্ধতিতে একটি তালিকা প্রদানের জন্য চাপ দেন। তারই অংশ হিসেবে এ তালিকা দেওয়া হয়েছে। তবে এ তালিকা নিয়েও ক্ষুব্ধ হয়েছেন নেতারা। তারা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এ তালিকায় তাদের দেওয়া বেশিরভাগ সুপারিশ আমলে না নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।

বিষয়টি নিয়ে তারা সম্প্রতি ডিএইর মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিমের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন। তাতে নেতৃত্ব দেন অ্যাবের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান কায়সার এবং সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেন বিপ্লব। বৈঠকে পিডি পদপ্রত্যাশী ও একটি প্রকল্পে পরিচালক হিসেবে আছেন এমন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি ও কর্মকর্তা জানান, আব্দুর রহিম কেন নেতাদের মতো করে তালিকাটি দেননি সে বিষয়ে জবাবদিহি চাওয়া হয়। তার ওপর ব্যাপকভাবে চাপ তৈরি করা হয়। সভার একপর্যায়ে নেতাদের কেউ কেউ উত্তেজিত আচরণও করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএইর মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, ‘এসব বিষয় নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে আগ্রহী নন।’

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এতগুলো প্রকল্পের পিডি পদের একসঙ্গে পদায়ন চাওয়ায় কৃষিমন্ত্রী খানিকটা অবাকই হয়েছেন। তিনি আপাতত এর বাস্তবায়ন স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এ তালিকায় এমন কর্মকর্তা আছেন, যারা আসলেই যোগ্য ও দক্ষ হওয়ার পরও শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তাদের ভালো এবং বড় পদে পদায়ন করা হয়নি। এমন কিছু কর্মকর্তার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের চিন্তার মধ্যে রয়েছে।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করা এবং প্রকল্প তৈরি করার পরও যারা পিডি হওয়ার সুযোগ পাননি এমন কর্মকর্তাদেরও নাম সুপারিশ করা হয়েছে। কিছু নাম রয়েছে, যারা শুধু বিএনপি ঘরানার বলে বিগত শেখ হাসিনা সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও প্রত্যাশা অনুযায়ী পদায়ন পাননি। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ ধরনের কর্মকর্তাদের কোনো প্রকল্পে পদায়ন না করার কারণেও তাদের মধ্যে অসন্তোষও রয়েছে। ফলে কর্মকর্তারা চান, যাতে কৃষি মন্ত্রণালয় বঞ্চিত ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত