শ্রীমঙ্গলে আনারস বিক্রিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পঁচিশোর্ধ পরিবার

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়নের সাতপাড়িয়া গ্রামের মো. শফিকুল ইসলাম। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান তার লেখাপড়া দরিদ্রতার কারনে বেশিদুর আগায়নি।

২০১৫ সালে দিনমজুর বাবা জমির মিয়া মারা যাবার পর শফিকুলদের পরিবারে নেমে আসে অমানিষার অন্ধকার। ওই সময় ২০ বছর বয়সী তরুণ শফিকুল পরিবারের হাল ধরেন। মা, ছোট দুই বোন ও এক ভাইকে নিয়ে পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান শফিকুল কখনও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে, কখনও রাজমিস্ত্রী সহকারী হিসেবে কাজ করে পরিবারের বোঝা টানতে থাকেন। যেদিন কাজ থাকে না সেদিন তার পরিবারের পেটে ভাতও জোটেনি।

২০২০ সালে শফিকুল তার প্রতিবেশি এক বন্ধুর মাধ্যমে শ্রীমঙ্গলের বধ্যভূমি একাত্তর থেকে রাধানগর এলাকা পর্যন্ত ভ্যান গাড়িতে আনারস বিক্রির কাজ শুরু করেন। এসব এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি শত-শত পর্যটকে মুখরিত থাকে। বিশেষ করে সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার যেন পর্যটকের ঢল নামে। শ্রীমঙ্গলে আগত পর্যটকদের কাছে আনারস কেটে বিট লবন, মরিচগুড়ো মাখিয়ে বিক্রি করে এখন শফিকুল স্বাবলম্বী। পরিবারে এসেছে স্বচ্ছলতা। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে গড়ে প্রতিদিন তিনি বিক্রি করছেন ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার রসালো আনারস।

এতে শফিকুলের লাভ হয় দুই হাজার টাকার মতো। ভ্যান গাড়িতে আনারস বিক্রির লভ্যাংশ দিয়ে নিজে বিয়ে করা ছাড়াও দুই বোনকে পাত্রস্থ করেছেন তিনি। শফিকুল জানান, এখন আর তার পরিবারে অভাব নেই। ছোট ভাইকে শেখাচ্ছেন লেখাপড়া।

শুধু শফিকুল নয়, দেশের পর্যটন নগর হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত পর্যটন এলাকায় ভ্যানে করে আনারস বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন শহরের গুহ রোডের বাসিন্দা হেলাল মিয়া, শান্তিবাগ আবাসিক এলাকার নোমান হোসেন, জামাল হোসেন রনি, শহরতলীর শাহীবাগ আবাসিক এলাকার সুজন মিয়া, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, জুবায়ের পলাশ, ৬ নম্বর আশীদ্রোন ইউনিয়নের মোহাজেরাবাদ গ্রামের মোশারফ হোসেন, ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের মো. জালাল মিয়া, আব্দুস সালাম, জয়নাল আবেদিন, লালবাগ আবাসিক এলাকার আলাল মিয়া, সবুজবাগ আবাসিক এলাকার সুবল দেবনাথ, ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়নের দোগাংগা গ্রামের মো. নুর মিয়া প্রমুখ।

দৈনিক দেশ রূপান্তরকে আনারস বিক্রেতা সুজন মিয়া বলেন, এক সময় বেকার জীবন যাপন করতাম। শ্রীমঙ্গলে প্রচুর পরিমাণ পর্যটক আগমনের কারণে ভ্যানে করে বাগানের তাজা আনারস বিক্রি শুরু করি। সপ্তাহের রবি থেকে বৃহস্পতিবার প্রতিদিন শুধু বিকেল বেলা এবং শুক্রবার ও শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেচাকেনা হয়। এ ব্যবসা করে ভালো আছি। আমরা প্রায় ২৫ জনের মতো রিকশা ভ্যানে করে আনরাস কেটে বিক্রি করছি। প্রতিটি আনারস বড় সাইজ ভেদে ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করি। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫-৬ হাজার টাকার আনারস বিক্রি হয়। এখন অনেক ভালো আছি।

আনারস বিক্রেতা মো. জালাল মিয়া বলেন, শ্রীমঙ্গল বর্তমানে পর্যটকদের জন্য একটি উৎকৃষ্ট স্থান। বহু মানুষ প্রতিদিন এখানে ভ্রমণে আসেন। এখানে প্রচুর পরিমাণে আনারস উৎপন্ন হয়। এসব আনারসের অধিকাংশই এক সময় শ্রীমঙ্গলের বাইরে বিক্রি হতো। এখন আর বাইরে বিক্রির জন্য পাঠাতে হয় না।

প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার আনারস বিক্রি করতে পারছি। লাভও হয় ভালো। পরিবার চালাতে এখন আর চিন্তা করতে হয় না।

সুবল দেবনাথ বলেন, আমরা ভ্যানে করে আনারস বিক্রেতারা বধ্যভূমি একাত্তর চত্ত্বর থেকে পাঁচ তারকা মানের রিসোর্ট গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের সামনে পর্যন্ত চা বাগানের পাশে ভ্যান গাড়িতে করে আনারস কেটে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করছি। এ ব্যবসায় পুঁজি হলো ভ্যান গাড়ি ও আনারস কেনা। প্রতিদিন গড়ে ৭-৮ হাজার বিক্রি হয়।

আলাল মিয়া বলেন, আমরা শ্রীমঙ্গলে সুনাম যাতে ক্ষুন্ন না হয় সেদিকে নজর রাখি। আমাদের এলাকার রসালো আনারস আমরা ন্যায্যমূল্যে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করি। প্রতি পিছ আনারস কেটে বিক্রি করছি ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকার মধ্যে। আমরা যারা ভ্যানে করে আনারস বিক্রি করছি তাদের ব্যবহারে পর্যটকরা মুগ্ধ হন।

রাজধানীর কেরানীগঞ্জ থেকে সপরিবারে শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে আসা সাফিয়া বেগম বলেন, শ্রীমঙ্গলে এসে এভাবে রিকশা ভ্যানে আনারস কেটে বিক্রির বিষয়টি দেখলাম। খুব স্বল্পমূল্যে তাজা আনারস খেতে পেরে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা খুব খুশি। সাধারণত পর্যটন এলাকায় জিনিসপত্রের দাম থাকে একটু চড়া। কিন্তু আনারস খেতে গিয়ে দেখলাম দাম তুলনামূলক অনেক কম। আনারস বিক্রেতাদের ব্যবহারও চমৎকার। এছাড়া আনারস কাটার পর পরিস্কার পানিতে ধুয়ে মশলা দিয়ে আমাদের পরিবেশন করেছে। বিষয়টি খুব পুলকিত করেছে আমাদের।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কাজীপাড়া এলাকার মো. মশিউর রহমান সানু বলেন, শ্রীমঙ্গলে এসে কম দামে খুবই মজাদার আনারস খেলাম। যে আনারস আমরা ৩০ টাকায় খেয়েছি এটি আমাদের শহরে হলে দাম হতো কমপক্ষে ৫০ থেকে ৬০ টাকা হতো। 
সুনামগঞ্জের শাহিনুর রহমান বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসার কাজে আমাকে যেতে হয়। কত রকম ব্যবসা দেখেছি এ জীবনে। তবে শ্রীমঙ্গলের পর্যটন স্পটগুলোর আশেপাশে রিকশা ভ্যানে করে স্থানীয় রসালো পণ্য আনারসের এ ধরণের ব্রন্ডিং খুবই ভালো লেগেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত