ভয়ংকর রূপে ডেঙ্গু

সমন্বিত ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম

রাজধানীসহ সারা দেশে ভয়ংকর আকার ধারণ করছে ডেঙ্গু। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম যে আশাব্যঞ্জক নয়, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নি®প্রয়োজন। গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুতে মানুষ সারা বছরই আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রাণহানি ঘটছে। এবারের চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে ইতিমধ্যে ২০১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর এক দিনে এক হাজার ৮৬৮ জন ডেঙ্গুরোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরও মিলেছে। ওই দিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গু-বিষয়ক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৭৮ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১৭ জন, ঢাকা বিভাগে সিটি করপোরেশনের বাইরে ৪০৫ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ১৭৩ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭৯ জন, খুলনা বিভাগে ২৮০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১৩ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৫৬ জন, রংপুর বিভাগে ৫৯ জন এবং সিলেট বিভাগে আটজন।

আমরা জানি, বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তিন মাসব্যাপী ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় আগামী তিন মাসকে ঝুঁকিপূর্ণ সময় বিবেচনায় নিয়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। কিন্তু আমরা দেখছি, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সচেতন জনগোষ্ঠী উদ্বুদ্ধ হয়ে সামাজিক বহুমুখী কার্যক্রম জোরদার করলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর

যথাযথ কর্মতৎপরতা চলছে ঢিলেঢালাভাবে। অভিযোগ আছে, মশক নিধনের ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও। ‘দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’ নামে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর সংগতই আশা জেগেছিল দায়িত্বশীল মহলগুলো বিরতিহীন ক্রাশ প্রোগ্রাম আরও জোরদার হবে। আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলো প্রধানমন্ত্রী ঘোষণার বাস্তবায়ন করে সুফল দৃশ্যমান করুক।  

বিগত ২৩ দিনে বছরের ৫২ শতাংশ মৃত্যু ও ভর্তি ৪৭ শতাংশের তথ্যও উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে। ঢাকায় ৯০ শতাংশই ডেন-৩ ধরনের ডেঙ্গু। এও বলা হয়েছে, রাজধানীর বাইরে ঝুঁকি বাড়ছে জেলাগুলোতে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আগস্টের পর থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটছে। পার্বত্য অঞ্চলে ডেন-২-এর প্রকোপ বেশি হলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ডেন-৩-এর প্রকোপও সমান্তরালে দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এবার ডেঙ্গু আক্রান্তদের অনেকেরই প্লাটিলেট ঊর্ধ্বমুখীর পর পেটে পানি জমছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাকস্থলী সংক্রমণেরও সন্ধান মিলছে। ডেঙ্গু যেহেতু সংক্রামক ব্যাধি নয়, তাই এ ক্ষেত্রে এডিস মশা নির্মূল, উপসর্গ দেখা দেওয়া মাত্র চিকিৎসার আওতায় যাওয়া ও সচেতনতাই ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষা ও পরিত্রাণের পথ।

‘ভয়ংকর সেপ্টেম্বর’ দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনের এই শিরোনামই বলে দিচ্ছে বিদ্যমান পরিস্থিতি কতটা প্রকট হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় আমরা মনে করি, চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাপারে আরও পরিকল্পিত ও সহজলভ্য সেবা নিশ্চিতকরণে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। চিকিৎসা উপকেন্দ্র তৈরি করে পরীক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে উপসর্গধারীদের জীবন ঝুঁকির আগেই ত্বরিত সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কার এখন এ প্রশ্ন আর মুখ্য নয়, পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবিলা করাই মুখ্য। যূথবদ্ধভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারে, এও আমরা সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছিলাম। কিন্তু আমরা লক্ষ করছি, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই দায়সারা ভাব পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। এ থেকে নিষ্কৃতির জন্য যা কিছু করণীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সেই পথ সুগম করতে হবে আর সময়ক্ষেপণ না করে। ডেঙ্গু যেমন একদিকে প্রাণহানি ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়াচ্ছে আর্থিক ক্ষতি এবং এর পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সংকটও প্রকট করে তুলছে। সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে যা কিছু করণীয় তা দ্রুত নিশ্চিত করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।  

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত