চীন যেভাবে বিশ্বে ক্রীড়া সাম্রাজ্য গড়ে তুললো

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

একটি দেশকে ক্রীড়াশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে কতটা সময় লাগে? চীনের গল্প বলছে, শুধু প্রতিভাবান খেলোয়াড় থাকলেই হয় না, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিশাল অবকাঠামো, প্রতিভা খোঁজার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়মিত নিজেদের পরীক্ষা করার সুযোগ।

অলিম্পিক গেমস, এশিয়ান গেমস কিংবা এশিয়ান বিচ গেমস কিংবা ফিফা ও এএফসির মতো বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের সঙ্গে চীনের নাম এখন প্রায় অবিচ্ছেদ্য। নিজেদের মাটিতে বড় আসর আয়োজনের পাশাপাশি বিদেশের মাটিতেও পদকের লড়াইয়ে নিয়মিত শীর্ষে থাকছে দেশটি। ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকে ৪০টি স্বর্ণ, ২৭টি রৌপ্য ও ২৪টি ব্রোঞ্জসহ মোট ৯১টি পদক জিতেছে চীন। 

স্বর্ণপদকের সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমান ছিল তারা; রৌপ্যপদকের সংখ্যায় পিছিয়ে থাকায় সামগ্রিক তালিকায় দ্বিতীয় হয়। অর্থাৎ ‘সবাইকে পেছনে ফেলে’ এককভাবে বিশ্বসেরা, এমন সরল চিত্র নয়; বরং চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রীড়া দেশগুলোর একটি এবং বহু অলিম্পিক ডিসিপ্লিনে দীর্ঘদিনের আধিপত্য ধরে রেখেছে।

এশিয়ায় চীনের একচ্ছত্র দাপট

এশিয়ান গেমসে চীনের আধিপত্য আরও স্পষ্ট। ২০২৩ সালে হাংঝু এশিয়ান গেমসে ২০১টি স্বর্ণসহ মোট ৩৮৩টি পদক জিতে শীর্ষে ছিল স্বাগতিকরা। প্রথম দেশ হিসেবে এক আসরে ২০০ স্বর্ণের মাইলফলকও পেরিয়ে যায় চীন।

২০২৩ সালে হাংঝু এশিয়ান গেমসে ২০১টি স্বর্ণসহ মোট ৩৮৩টি পদক জিতেছিল চীন, ছবি: সংগৃহীত

শুধু একটি আসরের সাফল্য নয়, এশিয়ান গেমসের ইতিহাসেও চীন অনেক এগিয়ে। ২০২২ হাংঝু আসর পর্যন্ত দেশটির সংগ্রহ ছিল ১ হাজার ৬৭৪ স্বর্ণ, ১ হাজার ১০৫ রৌপ্য ও ৭৯১ ব্রোঞ্জ, মোট ৩ হাজার ৫৭০ পদক।

এই আধিপত্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতা। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে চীনের উত্থান শুরু হলেও পরবর্তী দশকগুলোতে তারা সেই সাফল্যকে আরও বিস্তৃত করেছে। এখন আর শুধু টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন, ডাইভিং বা ভারোত্তোলনের মতো ঐতিহ্যবাহী খেলায় নয়, নতুন নতুন খেলাতেও চীনা অ্যাথলেটরা নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন।

‘সোনার কারখানা’ থেকে বহুমুখী ক্রীড়া শক্তি

একসময় চীনের ক্রীড়া সাফল্যের সঙ্গে কয়েকটি নির্দিষ্ট খেলার নামই বেশি উচ্চারিত হতো। ডাইভিং ও টেবিল টেনিসে তাদের আধিপত্য এখনও প্রবল। প্যারিস অলিম্পিকে ডাইভিং ও টেবিল টেনিসে সব স্বর্ণ জিতেছিল চীন। ভারোত্তোলন ও শুটিংয়েও পেয়েছে একাধিক স্বর্ণ। পাশাপাশি আর্টিস্টিক সুইমিং, রিদমিক জিমন্যাস্টিকস, নারী বক্সিং ও টেনিসের মতো ক্ষেত্রেও নতুন সাফল্য এসেছে।

টেনিসে ঝেং কিনওয়েনের স্বর্ণ কিংবা সাঁতারে প্যান ঝানলের বিশ্বরেকর্ড—এগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, চীনের ক্রীড়া সাফল্য এখন আর কেবল ঐতিহ্যবাহী ডিসিপ্লিনে আটকে নেই। এমনকি ইগঢ ফ্রিস্টাইল, স্পোর্ট ক্লাইম্বিং, স্কেটবোর্ডিং ও ব্রেকিংয়ের মতো তুলনামূলক নতুন অলিম্পিক খেলাতেও চীনের তরুণরা উঠে আসছেন।

২০২৪ অলিম্পিকে চীনের প্রথম স্বর্ণ ছিল ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে, ছবি: সংগৃহীত

প্রতিভা খোঁজার শুরুটা স্কুল থেকেই

চীনের ক্রীড়া ব্যবস্থার বড় শক্তিগুলোর একটি হলো ছোট বয়স থেকেই প্রতিভা শনাক্ত করার চেষ্টা। স্কুল, স্থানীয় ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ কাঠামোর মাধ্যমে সম্ভাবনাময়দের সামনে আনা হয়। খেলাধুলাকে শুধু আন্তর্জাতিক পদকের মাধ্যম হিসেবে নয়, শিশু-কিশোরদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবেও বিস্তৃত করার চেষ্টা রয়েছে।

২০২১ সাল থেকে চীনের ‘রান, ইয়ুথ’ কর্মসূচিতে ১২ কোটির বেশি তরুণ অংশ নিয়েছে বলে দেশটির ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সেখানে প্রতিযোগিতা, ক্রীড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কার্যক্রম রাখা হয়েছে। অর্থাৎ একজন চীনা অ্যাথলেট যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে উঠে আসেন, তার প্রস্তুতি অনেক সময় শুরু হয় বহু বছর আগে, স্কুলের মাঠে, স্থানীয় প্রতিযোগিতায় কিংবা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে।

জাতীয় গেমসই হয়ে ওঠে অলিম্পিকের প্রস্তুতিমঞ্চ

চীনের জাতীয় গেমসও দেশটির ক্রীড়া কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে টেবিল টেনিস, ডাইভিং বা ভারোত্তোলনের মতো কিছু খেলায় জাতীয় পর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এই জাতীয় প্রতিযোগিতাগুলো থেকেই ভবিষ্যৎ অলিম্পিয়ানদের বাছাই ও পরখ করার সুযোগ তৈরি হয়। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনা অ্যাথলেটরা ৫১৯টি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা জিতেছে এবং ৬৮টি বিশ্বরেকর্ড ভেঙেছে বলে চীনের সরকারি ক্রীড়া তথ্যসূত্র জানিয়েছে। এখানেই চীনের ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে, অলিম্পিকের চার বছর পরপর অপেক্ষা না করে সারা বছরই বড় পরিসরে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা।

মাঠের পাশাপাশি বিজ্ঞানও

আধুনিক ক্রীড়ায় শুধু শারীরিক সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। পারফরম্যান্স অ্যানালাইসিস, পুষ্টি, পুনর্বাসন, ক্রীড়া চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও মানসিক প্রস্তুত; সবকিছুই এখন গুরুত্বপূর্ণ। চীনও এই জায়গাগুলোতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। দেশটির ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীনা অ্যাথলেটরা ১ হাজার ২৪৪টি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে এবং ১৬১টি বিশ্বরেকর্ড করেছে। প্যারিস অলিম্পিকের ৪০ স্বর্ণও ছিল বিদেশের মাটিতে তাদের সবচেয়ে সফল অলিম্পিক পারফরম্যান্স।

এখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এর পাশাপাশি ক্রীড়াকে সাধারণ মানুষের জীবনেও ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ২০২৩ সালের শেষে চীনে ক্রীড়া সুবিধার মাথাপিছু আয়তন ২.৮৯ বর্গমিটারে পৌঁছেছিল এবং নিয়মিত শরীরচর্চায় অংশ নেওয়া মানুষের হার ৩৭.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল বলে দেশটির সরকারি তথ্য জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক আয়োজনও কৌশলের অংশ

চীন শুধু অ্যাথলেট পাঠায় না, বড় বড় ক্রীড়া আয়োজনও করে। বেইজিং ২০০৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক, ২০২২ শীতকালীন অলিম্পিক, গুয়াংঝু ২০১০ এশিয়ান গেমস এবং হাংঝু ২০২২ এশিয়ান গেমস, এ ধরনের আয়োজন দেশটির ক্রীড়া অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছে।

২০২৪ সালে সাংহাইয়ে প্রথম অলিম্পিক কোয়ালিফায়ার সিরিজের একটি পর্ব আয়োজন করেছিল চীন। ব্রেকিং, বিএমএক্স ফ্রিস্টাইল, স্কেটবোর্ডিং ও স্পোর্ট ক্লাইম্বিংয়ের অ্যাথলেটরা সেখানে প্যারিস অলিম্পিকের যোগ্যতা অর্জনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

ফলে বড় আয়োজন চীনের জন্য শুধু আয়োজক হওয়ার সুযোগ নয়; নিজেদের দর্শক, অবকাঠামো ও তরুণ প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার সঙ্গে যুক্ত করারও একটি মাধ্যম।

ক্রীড়া এখন বড় অর্থনীতিও

চীনের ক্রীড়া উত্থানের আরেকটি দিক অর্থনীতি। ২০২৪ সালে দেশটির ক্রীড়া শিল্পের মোট উৎপাদনমূল্য ৩.৮৪২১ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ক্রীড়া পরিষেবা, প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া পণ্য উৎপাদন, ভেন্যু ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য খাত রয়েছে। ক্রীড়া শিল্পের মূল্য সংযোজন ছিল ১.৬০৩৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা দেশটির জিডিপির ১.১৯ শতাংশ। অর্থাৎ চীনে ক্রীড়া এখন শুধু মেডেল জেতার প্রকল্প নয়; এটি একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, বিনোদন, পর্যটন, ভোক্তা বাজার, কর্মসংস্থান ও শিল্পের অংশ।

নি হাও চায়না, বাংলাদেশ আর্ট কম্পিটিশনে বাংলাদেশস্থ চীনা দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সিলর লি শাওপেং, ছবি: সংগৃহীত

সামনে আরও বড় লক্ষ্য

চীনের ক্রীড়া অগ্রগতির গল্প তাই শুধু অলিম্পিকের পদক দিয়ে শেষ হয় না। একদিকে এলিট অ্যাথলেট তৈরির কঠোর কাঠামো, অন্যদিকে স্কুল ও গণমানুষের মধ্যে খেলাধুলার বিস্তার, দুই ধারাই পাশাপাশি চলছে। প্যারিসে ৪০ স্বর্ণ, হাংঝুতে ২০১ স্বর্ণ, পরিসংখ্যানগুলো চীনের বর্তমান অবস্থান বোঝায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি সম্ভবত অন্য জায়গায়: যে দেশ একসময় কয়েকটি নির্দিষ্ট খেলায় আধিপত্যের জন্য পরিচিত ছিল, তারা এখন নতুন নতুন ডিসিপ্লিনেও নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। 

এশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনে চীনের দীর্ঘদিনের আধিপত্য এখন বিশ্ব মঞ্চেও দৃশ্যমান। অলিম্পিকের প্রতিটি আসরে পদকের লড়াইয়ে তাদের উপস্থিতি তাই আর বিস্ময়ের বিষয় নয়; বরং আধুনিক চীনের দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া পরিকল্পনার ফল হিসেবে সেটি ক্রমেই প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

ক্রীড়ায় বিভিন্ন দেশের পাশে চীন

ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদের শক্ত অবস্থানের পাশাপাশি অন্য দেশগুলোর ক্রীড়া উন্নয়নেও দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে চীন। ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণ, স্টেডিয়াম সংস্কার, কোচ ও অ্যাথলেটদের প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া প্রযুক্তি এবং বড় আন্তর্জাতিক আসর আয়োজনের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার পরিধি বাড়িয়েছে দেশটি। আফ্রিকা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশ, বিভিন্ন অঞ্চলে চীনের এই ক্রীড়া সহযোগিতার নজির রয়েছে।

চীন-আফ্রিকা সহযোগিতার সাম্প্রতিক পরিকল্পনাতেও ক্রীড়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত স্টেডিয়াম থেকে অ্যাথলেট প্রশিক্ষণ, ক্রীড়ায় বিভিন্ন দেশের পাশে চীন

ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদের শক্ত অবস্থানের পাশাপাশি অন্য দেশগুলোর ক্রীড়া উন্নয়নেও দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে চীন। ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণ, স্টেডিয়াম সংস্কার, কোচ ও অ্যাথলেটদের প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া প্রযুক্তি এবং বড় আন্তর্জাতিক আসর আয়োজনের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার পরিধি বাড়িয়েছে দেশটি। আফ্রিকা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশ, বিভিন্ন অঞ্চলে চীনের এই ক্রীড়া সহযোগিতার নজির রয়েছে।

চীন-আফ্রিকা সহযোগিতার সাম্প্রতিক পরিকল্পনাতেও ক্রীড়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘Forum on China-Africa Cooperation (FOCAC) Beijing Action Plan’ ২০২৫-২০২৭-এ আফ্রিকায় গণক্রীড়া ও বিভিন্ন ক্রীড়া ডিসিপ্লিনের উন্নয়নে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আফ্রিকার উচ্চপর্যায়ের অ্যাথলেটদের প্রস্তুতিতে সহায়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

স্টেডিয়াম নির্মাণ ও সংস্কারে সহযোগিতা

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সহায়তার একাধিক উদাহরণ রয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কমোরোসে স্টেডিয়াম ও সুইমিং পুল প্রকল্প, তিউনিসিয়ার মেনজাহে অলিম্পিক স্টেডিয়াম পুননির্মাণ, কাবো ভার্দের ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে কারিগরি সহায়তা এবং সেনেগালের ডাকার ২০২৬ সামার ইয়ুথ অলিম্পিকের প্রস্তুতিতে স্টেডিয়াম রক্ষণাবেক্ষণ, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য অবকাঠামো তৈরি নয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যও সামনে রাখা হচ্ছে।

অ্যাথলেট ও কোচদের প্রশিক্ষণ

ক্রীড়া উন্নয়নে চীনের সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশিক্ষণ। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ দেখা গেছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ টোঙ্গায়। ২০২৫ সালে চীন-সহায়তায় পরিচালিত একটি স্পোর্টস টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামে টোঙ্গার অ্যাথলেট ও কোচরা চীনে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষণটি অংশগ্রহণকারীদের নতুন অভিজ্ঞতা ও উন্নত কৌশল শেখার সুযোগ দেয়। চীন ২০৩১ সালের চধপরভরপ এধসবং আয়োজনের প্রস্তুতিতেও টোঙ্গাকে সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।এই ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে শুধু খেলোয়াড় নয়, কোচ ও ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও যুক্ত হচ্ছেন। ফলে এর প্রভাব মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি স্থানীয় ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ কাঠামোতেও পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক আসরের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি

বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর আয়োজনের অভিজ্ঞতাও অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করছে চীন। বেইজিং ২০০৮ অলিম্পিক, বেইজিং ২০২২ শীতকালীন অলিম্পিক, ২০২৩ এশিয়ান গেমস এবং ২০২৫ এশিয়ান উইন্টার গেমস আয়োজনের অভিজ্ঞতা থেকে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা করছে দেশটি।

জাতিসংঘে চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি ২০২৫ সালে জানান, বড় ক্রীড়া আসরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় চীন অন্যান্য দেশের সঙ্গে অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ ভাগাভাগি করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ক্রীড়া আসরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কারিগরি সহায়তার কথাও সেখানে তুলে ধরা হয়।

আফ্রিকায় ক্রীড়া সহযোগিতার নতুন পর্ব

আফ্রিকায় ক্রীড়া সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনাও রয়েছে চীনের। ‘Africa Cup of Nations’-এর ২০২৫-২৭ কর্মপরিকল্পনায় ২০২৬ সালের ‘Summer Youth Olympic Games’।  এবং ২০২৭ সালের আয়োজনকে সমর্থনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি আফ্রিকায় গণক্রীড়া ও বিভিন্ন ক্রীড়া ইভেন্টের উন্নয়নে সহযোগিতার পরিকল্পনাও রয়েছে। চীন-আফ্রিকা সহযোগিতার আওতায় উশু ও টেবিল টেনিসেও বিশেষ উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। আফ্রিকায় চীন-আফ্রিকা উশু বিনিময় ফোরাম, টেবিল টেনিস প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গেও ক্রীড়া যোগাযোগ

বাংলাদেশের সঙ্গেও চীনের ক্রীড়া সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের চীন-বাংলাদেশ যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের ক্রীড়া সংগঠনগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর কথা বলা হয়। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে ক্রীড়া, যুব ও অন্যান্য ক্ষেত্রে জনসম্পর্কভিত্তিক বিনিময় জোরদারের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সহযোগিতার সুযোগে বাংলাদেশসহ অনেক দেশের ক্রীড়াকর্মীরাও নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পাচ্ছেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রীড়া সম্পর্কের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো টেনিস। দীর্ঘদিন ধরে চীনের বিভিন্ন একাডেমি ও ক্লাবে কাজ করছেন বাংলাদেশি টেনিস কোচরা। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, চীনের বিভিন্ন প্রদেশে প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি টেনিস কোচ কাজ করছেন। এই যাত্রার অন্যতম পথিকৃৎ সুকুমার রায় ২০০৫ সালে চীনে কোচিং শুরু করেন। তার পথ ধরে পরবর্তী দুই দশকে বাংলাদেশি কোচদের জন্য চীনের টেনিস অঙ্গনে তৈরি হয়েছে বড় একটি কর্মক্ষেত্র। জাতীয় দলের সাবেক টেনিস খেলোয়াড় ও আইটিএফ-পিটিআই সনদধারী কোচ আখতার হোসেনও দীর্ঘদিন ধরে চীনে কাজ করছেন। তিনি চীনের বিভিন্ন একাডেমিতে কাজ করার পাশাপাশি ইউরোপীয় কোচদের সঙ্গেও কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এমনকি চীনের তারকা টেনিস খেলোয়াড় ঝেং কিনওয়েনের উত্থানের সময় তার কোচিং দলের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার প্রীতি ম্যাচের পর ফুটবলার ও কর্মকর্তারা, ছবি: সংগৃহীত

শুধু পুরুষ কোচ নন, বাংলাদেশের নারী কোচরাও চীনের টেনিসে জায়গা করে নিয়েছেন। সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন রুমা সাংহাইয়ে কোচিং করছেন। সাফিনা শাহ লাক্সমীও শেনঝেনে কাজ করছেন। ফলে চীনের টেনিস অবকাঠামো বাংলাদেশের কোচদের জন্য যেমন পেশাগত সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি তাদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের পথও খুলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চীনের সঙ্গে ক্রীড়া সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আলোচনা চলছে। ২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন খেলায় খেলোয়াড় ও কোচদের প্রশিক্ষণে চীনের সহযোগিতা চাওয়া হয়। বিশেষ করে ভলিবল, আর্চারি, ব্যাডমিন্টন ও শুটিংয়ে দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে যুব প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও ক্রীড়া শিল্পে চীনা বিনিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

দুই দেশের সরকারি পর্যায়ের সম্পর্কেও ক্রীড়া বিনিময়ের বিষয়টি রয়েছে। ২০২৪ সালের বাংলাদেশ-চীন যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের ক্রীড়া সংগঠনগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর কথা বলা হয়। প্রতিবন্ধী ক্রীড়ার ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণ ও কারিগরি বিনিময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

একদিকে বাংলাদেশি কোচরা চীনের খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের খেলোয়াড় ও কোচদের জন্যও চীনের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের মানুষের চীনের সঙ্গে এই যোগাযোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হলে দুই দেশের ক্রীড়া সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত