প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের উল্লেখযোগ্য দিক

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৩ এএম

বিশ্ব যখন যুদ্ধ, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকিতে উদ্বিগ্ন, ঠিক সেই সময় জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বার্তা দিয়েছেন, তা কেবল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান নয় এটি একটি মানবিক ও শান্তিনির্ভর বিশ্বব্যবস্থার প্রত্যাশারও প্রকাশ। ২৪ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রথম ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, সংঘাতের সমাধান হওয়া উচিত আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। এই আহ্বান জানিয়ে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে এক মানবতার প্রতীক হিসেবে উদাহরণ তৈরি করেছেন এবং বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থের সুরক্ষা, সম্মান ও মর্যাদা। আরও তাৎপর্যপূর্ণভাবে তিনি এমন একটি মানবিক বিশ্বসমাজের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, যেখানে মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে। তিনি আরও বলেন, ‘বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছে। তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের গুরুত্ব বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যুদ্ধের আধুনিক প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হয়েছে, মানুষের নিরাপত্তা তত বেশি অনিশ্চিত হয়েছে। একটি সংঘাত শুধু যুদ্ধরত দুই রাষ্ট্রের সীমান্তে আটকে থাকে না; তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে খাদ্য, জ¦ালানি, বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি, অভিবাসন ও বৈশি^ক অর্থনীতিতে। তারেক রহমানও তার ভাষণে যুদ্ধ ও মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এখানেই তার ‘মারণাস্ত্র নয়, যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা’ এই ধারণার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিহিত। শক্তির রাজনীতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করেও তিনি শক্তির চূড়ান্ত ব্যবহার হিসেবে যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনাকে সামনে এনেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অবস্থান : মতপার্থক্য থাকবে, জাতীয় স্বার্থের সংঘাত থাকবে, কিন্তু সেই সংঘাতের সমাধানের পথ যেন মানুষের জীবন ধ্বংসের দিকে না যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘকে এমন একটি সমঝোতাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকবে। একই সঙ্গে তিনি সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শান্তিকে শুধু যুদ্ধ না থাকার অর্থে দেখেননি; বরং মানবিক মর্যাদা, উন্নয়ন, শিক্ষা, প্রযুক্তি, অভিবাসন ও অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে শান্তিকে যুক্ত করেছেন। তার ভাষণে অভিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, প্রযুক্তির ন্যায্য প্রবেশাধিকার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ও স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। জাতিসংঘে তারেক রহমান তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে সংকট সমাধানের কেন্দ্রে রাখার পাশাপাশি প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। ফিলিস্তিন প্রশ্নেও বাংলাদেশের অবস্থান তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনের কথা তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বহুপাক্ষিকতার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারও তুলে ধরেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের তাৎপর্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; রাষ্ট্র কতটা মানুষের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে তার ওপরও নির্ভর করে। বিশ্বমঞ্চে মানবতা, গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও শান্তির কথা বলার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও এসব মূল্যবোধকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা জরুরি। জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘জবংঃড়ৎরহম ঞৎঁংঃ, গধহধমরহম ঞৎধহংভড়ৎসধঃরড়হ: অ টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ঃযধঃ উবষরাবৎং ভড়ৎ অষষ-এর সঙ্গে তারেক রহমানের বক্তব্যের একটি সুস্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। বৈশি^ক আস্থার সংকট কাটাতে সংলাপ, সহযোগিতা ও কার্যকর বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। জাতিসংঘের মহাসচিবও অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে সংঘাত, পারমাণবিক উত্তেজনা, বৈষম্য, জলবায়ু সংকট ও প্রযুক্তির ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় আস্থা পুনর্গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

জাতিসংঘের মঞ্চে তারেক রহমানের বক্তব্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিশ্বকে শক্তির ভাষা থেকে মানবতার ভাষায় ফিরে আসার আহ্বান। যুদ্ধের পরিবর্তে সংলাপ, প্রতিশোধের পরিবর্তে কূটনীতি, অস্ত্রের পরিবর্তে শিক্ষা এবং আধিপত্যের পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান এই দর্শন বাস্তবায়ন সহজ নয়। কিন্তু বিশ্ব যদি সত্যিই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চায়, তাহলে এই মূল্যবোধগুলোকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতেই হবে। পৃথিবীকে আরও বিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে নিরাপদ করা যাবে কিনা, সেই প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত। কিন্তু শিক্ষা, মানবতা, ন্যায়বিচার, সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে মানুষের জীবনকে নিরাপদ করার পথ যে মানবসভ্যতার জন্য অপরিহার্য এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। মারণাস্ত্র মানুষকে ভয় দেখাতে পারে; কিন্তু মানবতা মানুষকে একত্রিত করতে পারে। আর সেই মানবিক আহ্বানই আজ বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে জরুরি বার্তাগুলোর একটি, যেটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বকে আহ্বান জানিয়েছেন।

লেখক : চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ (গভর্নিং বডি), কেন্দ্রীয় সদস্য, গবেষণা ও মনিটরিং উইং, বিএনপি

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত