পূর্বাচল স্টেডিয়াম নিয়ে বেকায়দায় বিসিবি

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৩ এএম

দুই সপ্তাহ পরই শেষ হয়ে যাবে পরিকল্পনার ৪৮ মাস। ২০২২ সালের ১২ অক্টোবর বেশ ঘটা করে আন্তর্জাতিক কনসালট্যান্ট পপুলাস পিটিই লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। পূর্বাচলে ‘দ্য বোট’খ্যাত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের জন্য করা ৩৪৭ পাতার চুক্তিপত্রে উল্লেখ আছে, ৩০ মাসের মধ্যে শেষ হবে এর নির্মাণ প্রক্রিয়া। এরপর ১২ মাস স্টেডিয়াম নিজেদের আয়ত্তে রেখে ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করবে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটি। সব মিলিয়ে ৪ বছরের চুক্তি।

যেখানে প্রথম ছয় মাসে স্টেডিয়ামটির নকশা তৈরি হওয়ার কথা ছিল। অথচ চার বছর শেষ হতে চললেও নকশার মারপ্যাঁচ থেকেই এখনো বের হতে পারেনি দুই পক্ষই। এই স্টেডিয়াম তৈরির পরিকল্পনার পর দেশে যতবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়া বইছে, ততবার ক্রিকেট বোর্ডেও পরিবর্তন এসেছে। প্রতিবারই নতুন নকশায় সেজেছে পূর্বাচল। তবে এবার পপুলাসও বেঁকে বসেছে। চুক্তির বাইরে যাবে না তারা। নিরুপায় ক্রিকেট বোর্ডও, বেকায়দায় পড়ে এখন সুদের বোঝা টানতে হচ্ছে তাদের।

শুরুতে নাজমুল হাসান পাপনের বোর্ড এই স্টেডিয়ামের নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরে ৯০০ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে সেটা দেড় হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। এরপর দেড় বছরের বেশি সময় পেলেও স্টেডিয়াম তৈরির দৃশ্যমান কোনো কাজই শুরু করতে পারেননি তারা। ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন ফারুক আহমেদ। সাবেক এই অধিনায়ক পূর্বাচল স্টেডিয়াম প্রসঙ্গে সে সময় বলেন, ‘দুটি মাঠ নিয়ে একটি বড় স্টেডিয়াম হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে এই স্টেডিয়ামের জন্য আমরা এত বড় বাজেট বরাদ্দ করতে পারব না। এ জন্য আমরা এই প্রকল্প থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

এরপর সেখানে খেলার উপযোগী করে একটি মাঠ প্রস্তুতির উদ্যোগ নেন ফারুক। সে মাঠে সর্বশেষ গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে সিসিডিএম টি-টোয়েন্টি চ্যালেঞ্জ কাপের ম্যাচ হয়েছে। আজ শুরু হতে যাওয়া তৃতীয় বিভাগ বাছাইপর্বের কয়েকটি ম্যাচও হওয়ার কথা আছে। এর মধ্যে আরও দুবার বিসিবির চেয়ারে পরিবর্তন এসেছে। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের পর সভাপতির দায়িত্ব নেন তামিম ইকবাল। তাতে আবারও গতি পায় পূর্বাচলে স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রক্রিয়া। ২০৩১ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সহযোগী আয়োজক বাংলাদেশও। এই স্বত্ব পেতে পূর্বাচল স্টেডিয়ামকে ভেন্যু হিসেবে উল্লেখ করেছে বিসিবি। এ জন্য তার আগে এই কাজ শেষ করতে তোড়জোড় শুরু করেছেন তামিম। তবে বিপত্তি বেধেছে পপুলাস পিটিই লিমিটেডের সঙ্গে করা পুরনো চুক্তি। জানা গেছে, চূড়ান্ত নকশা তৈরি করে বর্তমান বোর্ডের হাতে তুলে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এই নকশা অনুযায়ী কাজ করতে গেলে খরচ অনেক বাড়বে।

এ নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিসিবির কর্মকর্তা, ‘ওদের করা নকশা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে গেলে ৩৬০০ থেকে ৩৭০০ কোটি টাকা লাগবে। এত টাকা কোথায় পাবে বিসিবি! এটা তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাদের নকশায় একটা পাঁচ তারকা হোটেলও উল্লেখ আছে। কিন্তু আমরা মনে করছি, ঢাকার এত কাছে এত হোটেল করার কোনো কারণ নেই। এর সঙ্গে একটি আবাসিক ভবনও আছে এই নকশায়, সুইমিংপুল আছে। এগুলো এখন আমাদের না হলেও চলবে।’ নির্দিষ্ট করে খরচের অঙ্ক বলতে না চাইলেও গত বৃহস্পতিবার বোর্ডের গ্রাউন্ডস বিভাগের চেয়ারম্যান শানিয়ান তানিম প্রায় একই কথা শোনান, ‘এত টাকা খরচের প্রশ্নই আসে না। ৩৬০০ কোটি কে বলেছেন জানি না, তবে এটা অনেক বেশি। আমি নির্দিষ্ট করে টাকার অঙ্কটা বলতে না পারলেও এটা নিশ্চিত করতে পারি, খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনে আমরা হোটেল করব না। ডরমেটরি করব না। শুধু খেলা চালাতে যেসব জিনিসের প্রয়োজন, সেগুলোই আমরা অগ্রাধিকার দেব।’

এ জন্য নকশায় পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছে বিসিবি। সেখানে পাঁচ তারকা হোটেল, ডরমেটরিসহ একাধিক স্থাপনা বাদ দিয়ে নতুন করে একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্স যুক্ত করার কথা বলে বোর্ড। তবে এমন প্রস্তাবে রাজি হয়নি পপুলাস। এর জন্য নতুন চুক্তি ও আলাদা পারিশ্রমিকও চেয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘কিছু সংযোজন-বিয়োজন করে নতুন করে নকশা দিতে বলা হলেও তারা রাজি হয়নি। এ জন্য নতুন পরামর্শক খোঁজা হচ্ছে। আমরা চাচ্ছি আপাতত খেলার উপযোগী একটি স্টেডিয়াম বানাতে। যেখানে দ্রুত খেলা শুরু করা যাবে। আমাদের বাজেটে কিছু টাকা আছে। সেটা দিয়েই কাজ শুরু করা যাবে।’

পপুলাসের সঙ্গে আগের চুক্তিতেই বেশ ক্ষতির মুখে পড়েছে বিসিবি। সময়মতো পারিশ্রমিক না মেটানোয় সুদের বোঝা কাঁধে চেপেছে বোর্ডের। জানা গেছে, পপুলাসের পাওনা ৬ লাখ মার্কিন ডলার এখন ৯ লাখ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এ জন্য চুক্তির ধরন নিয়ে পাপনের বোর্ডের দিকে আঙুল তুললেন বর্তমান বোর্ডের একজন পরিচালক, ‘ওদিকে (এই নকশায় স্টেডিয়াম) হাঁটার কোনো সুযোগ নেই, সেটা বাস্তবসম্মত নয়। দেশের টাকা-পয়সা নষ্ট করতেই এমন ডিজাইন করানো হয়েছে। এই ডিজাইন দিয়ে আমরা কিছুই করতে পারব না।’ এ জন্য পপুলাসের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পথেই হাঁটছে বিসিবি। পাশাপাশি টাকাগুলো যেন কয়েক ধাপে দিতে পারে, সে রাস্তাও খুঁজছে বোর্ড। এ নিয়ে শানিয়ান বলেন, ‘আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি যে তাদের সঙ্গে চুক্তি রাখব নাকি বাতিল করব। আলোচনার মাধ্যমে আমাদের একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে আমরা তাদের আলাদা একটা ডিজাইন দিতে বলেছিলাম।’

বিসিবি চাচ্ছে পূর্বাচল স্টেডিয়াম প্রকল্পের জন্য সরকারের সহায়তা নিতে। জানা গেছে, এ জন্য চলতি পরিচালনা পর্ষদের তৃতীয় সভায় আলোচনা হয়, ১ হাজার কোটি টাকা চাইবে বোর্ড। তবে বেশ কয়েকজন পরিচালক জানান, ৫০০ কোটি পর্যন্ত আশা করছেন তারা। এর সঙ্গে বিসিবির দেড়শ কোটি টাকা খরচ করতে রাজি। যেটা সেন্টার অব এক্সিলেন্সের জন্য বরাদ্দ করেছে ক্রিকেট বোর্ড। কিন্তু চার বছর শেষ হতে চললেও এখনো নকশাই চূড়ান্ত করতে পারেনি বিসিবি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত