কমল-বনে কেশরদাম

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১১ এএম

মৃত্যুঞ্জয় রায়

‘এই শরৎ-আলোর কমল-বনে

বাহির হয়ে বিহার করে

যে ছিল মোর মনে মনে।

তারি সোনার কাঁকন বাজে

আজি প্রভাত-কিরণমাঝে,

হাওয়াতে কাঁপে আঁচলখানি,

ছড়ায় ছায়া ক্ষণে ক্ষণে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (এই শরৎ-আলোর কমল-বনে : গীতালী)

ভাদ্র শেষের আকাশ, তবু তার আঁচলাটা কলিমাখা। মেঘাচ্ছন্ন সকালবেলাটায় সে আকাশের কাজল-কালো ছায়া পড়েছে পদ্মবিলের জলের ওপর। জলটাও কালচে। তার ওপর ভাসছে কলমিলতা ও কেশরদামের লতা, পনচুলিমালা ও চাঁদমালা লতারা। জড়ো হয়েছে বড়নখা, বনমরিচ ও হেলেঞ্চা লতারাও। এদের ছাড়িয়ে লম্বা লম্বা ডাঁটির মাথায় ফুটে আছে শাল-সাদা শাপলা ও গোলাপি পদ্ম ফুলেরা। থালার মতো বড় বড় পদ্মপাতায় ছোট ছোট আরও অনেক জলজ গাছ চাপা পড়েছে। স্থির কাজল-কালো জলের ওপর দৌড়ে বেড়াচ্ছে জলপিপিরা। জলের ওপর জেগে থাকা ডগায় ডগায় বিহার করছে গঙ্গা ফড়িংয়ের দল। এ যেন বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীর সেই নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের চালতেপোতার বিল। বর্ষার অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে যখন নিশ্চিন্দিপুরের মাঠ-ঘাট, ডোবা ও বিল পানিতে থইথই করে, তখন পানির ওপর বুনো জলজ উদ্ভিদের যে দাম বা স্তূপ তৈরি হয়, সেখানে জলের ওপর ভেসে উঠেছে কেশরদাম, পানিমরিচ, পাতাশেওলা আর কলমিশাকের দল। এরূপ মনোমুগ্ধকর গ্রামীণ জলাশয়ের বর্ণনা বাংলা সাহিত্যে খুব কমই পাওয়া যায়।

সকাল আটটার মধ্যেই ঢাকা থেকে গিয়ে হাজির হলাম পথের পাঁচালী উপন্যাসের নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের সেই বিলের মতো এক পদ্মবিলে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার এ বিলের নাম হানকুর বিল। দাউদপুর ব্রিজটা পার হয়ে সে বিলের পাড়ে নামার আগেই মনে মনে ভাবছিলাম, আজ কেশরদাম ফুলের যেন দেখা পাই! অন্তত ষোলো বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক বিলে কেশরদাম ফুল দেখে তাকে নয়নতারা মনে করে ভুল করেছিলাম। পাতাগুলোও নয়নতারা গাছের পাতার মতো।

ছোট্ট কাঠের নৌকা, চারজন উঠে পড়লাম। সেই কাজল-কলো জলের ওপর দিয়ে ধীরগতিতে তিরতির করে সুতোর মতো ঢেউ তুলে নৌকা এগিয়ে চলল। যেদিকে তাকাই শুধু পদ্ম আর পদ্ম। ফুলের রঙ ফ্যাকাশে লাল বলে এই পদ্মকেই সংস্কৃত ভাষায় বলা হয়েছে কমল। সেই কমল-বনে গিয়ে সত্যিই দীর্ঘদিন পর দেখা হয়ে গেল জলবতী কেশরদামের সঙ্গে। দাম মানে স্তূপ বা গাদা। সে বিলে কেশরদাম পদ্মগাছের চাপে সেরকম দাম করে ছড়াতে পারেনি। বিক্ষিপ্তভাবে জন্মেছে। জলের ওপর দিয়ে লতিয়ে চলেছে। খাটো খাটো কলমির মতো নলাকার লালচে সবুজ সে লতাগুলোকে কে ভাসিয়ে রেখেছে এমন করে? মাটির সঙ্গেও ওর কোনো সংযোগ নেই। একটা লতা টেনে তুলতেই সে রহস্য আবিষ্কৃত হলো। লতা ফাঁপা, সে লতার প্রতিটি গিঁট থেকে কেশর তথা চুলের গুচ্ছের মতো কালচে শিকড় বেরিয়েছে, গোড়া দিকের গিঁটগুলোর প্রতিটি গিঁট থেকে নিচের দিকে মুখ করে ছোট ও লম্বা মুলার মতো সাদা দুটি বায়ুথলি বেরিয়েছে, অগ্রভাগ সরু। টিপ দিলে সেগুলোকে ফোম বা স্পঞ্জের মতো ঠেকল। এরাই সে উদ্ভিদকে জলের ওপর ভাসিয়ে রাখে। গিঁট থেকে পাতা জন্মে, ফুল ফোটে।

কেশরদামের বেশ কিছু স্থানীয় নাম আছেমালচা, পুটিদল, মালসি, পানিডোগা ইত্যাদি। ইংরেজি নাম ওয়াটার প্রিমরোজ। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম খঁফরিমরধ ধফংপবহফবহং ও গোত্র ওনাগ্রেসী। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামের প্রথমাংশ ‘লাউইগিয়া’ জার্মান চিকিৎসক ও উদ্ভিদবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান গটলিব লুডউইগ (১৭০৯-১৭৭৩)-এর নামের স্মারণিক। ‘অ্যাডসেনডেন্স’ একটি লাতিন শব্দ যার অর্থ ঊর্ধ্বমুখী বা তির্যকভাবে উপরের দিকে উঠা। এ গাছের বৃদ্ধির ধরনটাই এমন। ধারণা করা হয়, দক্ষিণ আমেরিকা এর আদিনিবাস, তবে নিশ্চিত না। এটি এশিয়ার বিভিন্ন ধানক্ষেতে দেখা যায়। বাংলাদেশের সর্বত্র বিশেষ করে আমন বা জলী আমন ধানের ক্ষেতে এদের দেখা যায়। আগাছা বা বন্য উদ্ভিদ হলেও কেশরদামের বেশ কিছু ঔষধি গুণ আছে। এ গাছ বেটে কাই করে মলমের মতো ক্ষত, কাটা-ছেঁড়া, আঘাতের ব্যথা সারাতে লাগানো হয়। সর্দি, কাশি ও জ্বরের উপশমের এর ব্যবহার আছে।

এটি একটি বহুবর্ষজীবী ভাসমান জলজ উদ্ভিদ যার সাদা ও স্পঞ্জের মতো ফোলা অংশ (বায়ুথলি) থাকে। এটি জলের উপরিভাগে উদ্ভিদকে ভাসতে সাহায্য করে। পাতা সরল, ডিম্বাকৃতি বা উপবৃত্তাকার ফলকবিশিষ্ট। বোঁটা খাটো, পাতার কক্ষ থেকে এককভাবে সাদা রঙের ফুল ফোটে। প্রতিটি ফুলে ৫টি বৃতি, ৫টি সাদা পাপড়ি ও কেন্দ্রস্থলে ১০টি হলদে পুংকেশর থাকে। ফল লম্বা, নলাকার ক্যাপসুল, দেখতে অনেকটা লবঙ্গের মতো, লালচে, মসৃণ বা রোমশ, ১০টি শিরায় চিত্রিত, বহু বীজধারী। বীজ মসৃণ, বেগুনি-বাদামি। প্রায় সারা বছরই কম-বেশি ফুল ফোটে, তবে মার্চ থেকে ডিসেম্বরে বেশি ফোটে। লতার কাটা টুকরো ও বীজ থেকে বংশবৃদ্ধি ঘটে।

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত