দেশে প্রতি বছর জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে জন্ম নেওয়া প্রায় ২০ হাজার শিশু চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানান।
ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘হার্ট অ্যাটাকের পাশাপাশি জন্মগত হৃদরোগও বাংলাদেশের বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে জন্ম নেয়। কিন্তু তাদের বড় অংশ সময়মতো শনাক্ত হয় না বা চিকিৎসা পায় না। প্রতি বছর মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার শিশুর জন্মগত হৃদরোগের অস্ত্রোপচার হয়। অর্থাৎ, ২০ হাজারের বেশি শিশু প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে।’
এমন বাস্তবতায় দেশের মানুষকে হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতন করার উদ্দেশে গতকাল মঙ্গলবার পালিত হয়েছে বিশ্ব হার্ট দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘একটি স্পন্দনও যেন বাদ না পড়ে।’
দেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন এমনটি জানিয়ে ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ মনে করেন, হার্ট অ্যাটাক এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় হৃদরোগ সমস্যা। আগে এই রোগ ৬০ বছরের পর বেশি দেখা যেত, এখন ৫০ বছর থেকেই শুরু হচ্ছে। অনেক সময় আরও কম বয়সী মানুষও আক্রান্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মগত হৃদরোগের অনেক লক্ষণ জন্মের পরই দেখা দেয়। কোনো শিশুর শ্বাসকষ্ট হলে, শরীর নীলচে হয়ে গেলে, দুধ খেতে সমস্যা হলে অথবা কান্নার সময় অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থা হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। জন্মের পরপরই যদি রোগ শনাক্ত করা যায়, তাহলে অধিকাংশ শিশুই চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।
ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘প্রতিটি শিশুর জন্মের পর হৃদরোগ আছে কি না, সেটি পরীক্ষা করা উচিত। আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা আছে; কিন্তু এটি আরও বিস্তৃত ও বাধ্যতামূলকভাবে চালু করা প্রয়োজন।’
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইএইচএমইর তথ্য উদ্ধৃত করে ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হৃদরক্তনালিজনিত রোগে মারা গেছেন ৪ লাখ ১৫ হাজার ২৮৬ জন। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মৃত্যুহার ২৩৫। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ-২০২২ অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর ৩৬ শতাংশই হৃদরোগজনিত। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও যক্ষ্মা, যার হার ১৯ শতাংশ।
দেশে হৃদরোগ চিকিৎসার সক্ষমতাও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা, এনজিওপ্লাস্টি, স্টেন্ট বসানো এবং বাইপাস সার্জারির সুযোগও বেড়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ডিএমএম ফারুক ওসমানী বলেন, জটিল হৃদরোগের অধিকাংশ চিকিৎসা এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীর মতো বিভাগীয় শহরগুলোতে সক্ষমতা বাড়ছে। তবে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের মতো সেবা দেশে এখনো চালু হয়নি। তিনি বলেন, আমরা শহরকেন্দ্রিক চিকিৎসা চাই না। আধুনিক চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ বিভাগীয় কেন্দ্র হয়ে ধীরে ধীরে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে চাই।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, একদিকে রোগী বাড়ছে, অন্যদিকে চিকিৎসায় জটিল ও ব্যয়বহুল হস্তক্ষেপের প্রয়োজনও বাড়ছে। হৃদরোগের চিকিৎসায় স্টেন্ট বসানোর প্রবণতা বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। ২০২০ সালে দেশে ১২ হাজার ৮৬৪ জনের হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে স্টেন্ট বসানো হয়েছিল। ৫ বছর পর ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৫১৪ জনে। অর্থাৎ ৫ বছরের ব্যবধানে স্টেন্ট বসানোর সংখ্যা বেড়েছে ১৮ হাজার ৬৫০ জন বা প্রায় ১৪৫ শতাংশ। ২০২১, ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৮ হাজার ৮৬২, ২২ হাজার ৯৩৩, ২৫ হাজার ৯৩৮ এবং ২৬ হাজার ৪৪৫।
এ ছাড়া, হৃদরোগের চিকিৎসায় বিভিন্ন সার্জারির প্রবণতাও বেড়েছে। ২০২০ সালে সার্জারি হয় ২ হাজার ৫৯৪ জনের। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ২৯ জন। এর আগে ২০২১, ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যথাক্রমে ২ হাজার ৫৬৬, ২ হাজার ৮৬৭, ৩ হাজার ১৩৯ এবং ২ হাজার ৯৭৫ হৃদরোগীর সার্জারি হয়েছে।
এ সময়ে হার্ট বাইপাস সার্জারির সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২০, ২০২১, ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে যথাক্রমে ৮৪৬, এক হাজার ৩৪৪, এক হাজার ৫৬৫, এক হাজার ৬৪৯, এক হাজার ৬২৫ ও দুই হাজার ৫৫৫ জনের বাইপাস সার্জারি হয়েছে।
সরকারি তথ্য মতে, এসব অস্ত্রোপচারের ৯৫ শতাংশ হয় ঢাকায়। এর বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগীয় শহরে সীমিত আকারে অস্ত্রোপচার হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠা-া ঘাম, বমিভাব, মাথা ঘোরা কিংবা ব্যথা, বাম হাত, কাঁধ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া এসব হার্ট অ্যাটাকের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে ঘরে বসে অপেক্ষা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যেতে হবে। কারণ হৃদযন্ত্রে রক্তপ্রবাহ যত বেশি সময় বন্ধ থাকে, হৃদপেশির ক্ষতিও তত বাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বায়ুদূষণ এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস থেকে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি দেখা দেয়। তারা মনে করেন, সময়মতো ঝুঁকি শনাক্ত, জীবনযাপনে পরিবর্তন এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর বড় অংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব।