একটি জঙ্গলে অন্যটি কেওড়া বনে

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৪ এএম

মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত চট্টগ্রামে নেওয়ার জন্য সরকারি অর্থে কেনা হয়েছিল দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স। একটি দেওয়া হয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে, অন্যটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। কিন্তু কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা সেই দুই সি-অ্যাম্বুলেন্স এখন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। এর মধ্যে একটি জরুরি রোগী পরিবহনে একদিনের জন্যও কাজে লাগেনি। অন্যটিও কিছুদিন চলার পর বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সন্দ্বীপের মুমূর্ষু রোগীদের এখনো সাধারণ যাত্রীর মতো নৌযানের জন্য ঘাটে অপেক্ষা করতে হয়।

বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে সন্দ্বীপ থেকে প্রতিদিনই সংকটাপন্ন রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে পাঠাতে হয়। গর্ভবতী নারী, নবজাতক, শিশু, বৃদ্ধ, হৃদরোগী ও দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যাই বেশি। স্থানীয় চিকিৎসকদের হিসাবে, সপ্তাহে অন্তত ২০-২৫ জন ঝুঁকিপূর্ণ রোগীকে দ্রুত চ্যানেল পার করে চট্টগ্রামে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এসব রোগীর জন্য নেই নির্দিষ্ট কোনো জরুরি নৌযান।

কোনো কাজে লাগেনি দুই সি-অ্যাম্বুলেন্স : উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি সি-অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়। ওই বছরের ১৭ এপ্রিল সেটি হারামিয়া ২০ শয্যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জরুরি রোগী পরিবহনের উদ্দেশ্যে নৌযানটি দেওয়া হলেও এর জন্য স্থায়ী চালক নিয়োগ ও জ্বালানি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। পরে ২০১৫ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে আরও একটি সি-অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়। এটি উপজেলা প্রশাসনের অধীনে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় সি-অ্যাম্বুলেন্সটির ক্ষেত্রেও চালক ও জ্বালানির কোনো স্থায়ী বরাদ্দ ছিল না। ফলে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা দুটি নৌযানই জরুরি রোগী পরিবহনে কার্যকর ব্যবস্থায় পরিণত হয়নি।

সরেজমিন দেখা যায়, প্রথম সি-অ্যাম্বুলেন্সটি অযতেœ পরিত্যক্ত অবস্থায় হারামিয়া ২০ শয্যা হাসপাতালের প্রাঙ্গণে জঙ্গলের মধ্যে, আর দ্বিতীয়টি গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে ম্যানগ্রোভ বনের ভেতরে পড়ে রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হলো শুধু চালক ও জ্বালানির ব্যবস্থা করলেই পুরনো নৌযান দুটি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ এগুলো সন্দ্বীপ চ্যানেলের মতো উত্তাল নৌপথে চলাচলের উপযোগী নয়।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. সৌনম বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সন্দ্বীপের রোগী পারাপার দীর্ঘদিনের সমস্যা। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য বিষয়টি পর্যালোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ হাওরের উপযোগী সি-অ্যাম্বুলেন্স সাগরে কেন? কেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ব্যবহৃত স্পিডবোটগুলো এইখানে দেওয়া হচ্ছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নৌযানের অপেক্ষায় ঘাটে রোগীর মৃত্যু : কার্যকর সি-অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় সংকটাপন্ন রোগীদের সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে একই নৌযানব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফেরি, জাহাজ কিংবা ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌযান ছাড়ার নির্দিষ্ট সময়ের পর রোগী নিয়ে ঘাটে পৌঁছালে অনেক সময় পারাপারের সুযোগ মেলে না। বর্ষাকালে চ্যানেল উত্তাল থাকলে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এরই মধ্যে নৌযানের অপেক্ষায় থেকে সাম্প্রতিক সময়ে গুপ্তছড়া ঘাটে দুজনের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জরুরি চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে নৌযানের অপেক্ষায় বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিনের মৃত্যু হয়। কিছুদিন পর একই ঘাটে অপেক্ষায় থেকে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সত্তরোর্ধ্ব ওসমান গণির মৃত্যু হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি কার্যকর সি-অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা থাকলে অন্তত জরুরি রোগীদের সাধারণ যাত্রী পরিবহনের সময়সূচির ওপর নির্ভর করতে হতো না। গুপ্তছড়া ঘাট এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহাদাৎ বলেন, ‘সন্দ্বীপ চ্যানেল পার হয়ে চট্টগ্রামে যেতে না পারায় গুপ্তছড়া ঘাটে এবং নৌযানেই সন্তান প্রসবের ঘটনা ঘটেছে অনেকবার। যথাসময়ে চিকিৎসাসেবা দিতে না পারায় নবজাতক কিংবা মায়ের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। অতীতে চট্টগ্রাম শহরে যেতে না পেরে চিকিৎসার অভাবে গুপ্তছড়া ঘাটে মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।’

রাতে ভরসা ছোট নৌকা : একাধিক রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনের বেলায় কোনোভাবে সংকটাপন্ন রোগীকে চট্টগ্রামে পাঠানো গেলেও রাতে পরিস্থিতি আরও কঠিন। রাতে নিয়মিত বৈধ নৌযান চলাচল না থাকায় তখন ভরসা করতে হয় ইঞ্জিনচালিত ছোট কাঠের নৌকা ও লাইফবোটের ওপর।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাঠের নৌকায় নিয়মিত ভাড়া জনপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকা হলেও রাতে জরুরি রোগী পারাপারে ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়। অনেক দরিদ্র পরিবারের পক্ষে হঠাৎ করে এত টাকা জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে অর্থের চেয়ে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় নিরাপদ যাতায়াত আন্দোলনকর্মী খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও লাইফবোটে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামে যেতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। জরুরি রোগী দ্রুত পারাপারের জন্য এটি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে না। সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুততম সময়ে চট্টগ্রামে নেওয়ার জন্য চালক ও জ্বালানির ব্যবস্থা করাসহ সন্দ্বীপ চ্যানেলে চলাচলের উপযোগী অন্তত দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স দিতে হবে।’

প্রয়োজন চ্যানেল উপযোগী নৌ-অ্যাম্বুলেন্স : স্থানীয়দের দাবি, বছরের পর বছর পরিত্যক্ত পড়ে থাকা দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে আর অর্থ ও সময় নষ্ট না করে সন্দ্বীপ চ্যানেলের ঢেউ, স্রোত ও নৌপথের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন সি-অ্যাম্বুলেন্স দিতে হবে। একই সঙ্গে চালক, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা পরিচালনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সন্দ্বীপবাসীর প্রশ্ন, সরকারি অর্থে কোটি টাকা ব্যয়ে সি-অ্যাম্বুলেন্স কেনার পরও যদি সংকটাপন্ন রোগীকে ঘাটে এসে সাধারণ যাত্রীর মতো নৌযানের অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে এসব নৌযানের উদ্দেশ্য পূরণ হলো কোথায়? তাদের দাবি, শুধু সি-অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ নয়; চালু ও কার্যকর সি-অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জরুরি মুহূর্তে একজন রোগীকে আর নৌযানের অপেক্ষায় জীবন হারাতে না হয়।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. আ ন ম বজলুল রশীদের অফিসিয়াল ল্যান্ড ফোনে কল করলে তার ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয়ে একজন বলেন, ‘এ বিষয় সচিব মহোদয় দেখেন না। আপনারা অতিরিক্ত সচিব এএনএম মঈনুল স্যারকে কল করুন।’

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এএনএম মঈনুল ইসলামকে মুঠোফোনে ফোন করলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি, পুরো বিষয়ে এখনো অবগত না। এ বিষয়ে অধিদপ্তরে অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত