অপেক্ষায় নারিকেল জিঞ্জিরা

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৪ এএম

নীলাভ সমুদ্রের ঢেউ যেন মৃদু ছোঁয়ায় সাদা বালুকাবেলাকে সোহাগ করে যাচ্ছে। দূরে দিগন্তে জেগে আছে সবুজে মোড়া ছোট এক স্বপ্নদ্বীপ সেন্টমার্টিন। প্রতি বছর শীতের শুরুতেই যখন দেশের একমাত্র এই প্রবাল দ্বীপে পর্যটন মৌসুমের ঘণ্টা বাজে, তখনই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পা পড়ে এই অতল দ্বীপে। সাগরের নীল জল আর আকাশের নীলিমার মিতালির মধ্যে পর্যটকদের চোখে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য সারি সারি নারিকেল গাছ। স্থানীয়দের কাছে এই দ্বীপটি সুপরিচিত ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামে। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে প্রকৃতির সাজানো এক কবিতা। প্রবালের রঙিন ছোঁয়া, কেয়াগাছের ঘন ছায়া আর সমুদ্রের অনন্ত আহ্বানের সঙ্গে এই নারিকেল গাছের সারি দ্বীপের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।

সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণের বিষয়ে বিধি-নিষেধ আছে। তবে নভেম্বর মাসে পর্যটকদের জন্য সীমিতভাবে উন্মুক্ত করা হয়। গত বছর ১ নভেম্বর থেকে দুই মাসের জন্য ভ্রমণের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়েছিল। তবে গত বছরের চেয়ে এ বছর আরও শিথিল হবে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

আসন্ন পর্যটন মৌসুম ও দ্বীপের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘সেন্টমার্টিনের মূল সৌন্দর্যই হচ্ছে এর সারি সারি নারিকেল গাছ আর সুনীল জলরাশি। শীতের মৌসুম আসার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপের মানুষ পর্যটকদের বরণ করে নিতে উন্মুখ হয়ে থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অন্য কারণে দ্বীপের বাসিন্দারা কিছুটা অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিলেন। আমরা আশা করছি, এবারের পর্যটন মৌসুমে সরকারি নিয়মাবলি মেনে দ্বীপে পর্যটকদের আগমন ঘটবে, যা স্থানীয়দের জীবন-জীবিকাকে সচল করবে। একই সঙ্গে দ্বীপের পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষায় আমরা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করছি।’ দ্বীপের প্রবীণ বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমাদের বাপ-দাদারা এই দ্বীপকে নারকেল জিনজিরা বলেই ডাকতেন। এখানকার নারকেল গাছগুলো শুধু আমাদের সৌন্দর্য নয়, আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। পর্যটকরা যখন দ্বীপে নামেন, এই সারি সারি গাছের দৃশ্য দেখেই তাদের মন জুড়িয়ে যায়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন আর অতিরিক্ত পর্যটনের চাপে কিছু গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা চিন্তার বিষয়।

দ্বীপের ডাব ব্যবসায়ী জাফর আলম জানান, ‘একসময় দৈনিক হাজার হাজার ডাব বিক্রি হতো। এখন পোকার আক্রমণে ডাবের ভেতরের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে, ফলন কমে গেছে অর্ধেকের বেশি। নারকেল জিনজিরার ডাব যদি হারিয়ে যায়, তবে দ্বীপের মূল আকর্ষণই শেষ হয়ে যাবে।’ আরেক ডাব বিক্রেতা করিম মিয়া বলেন, ‘পর্যটন মৌসুম শুরু হলে আমাদের ডাব বিক্রি ভালো হয়। পর্যটকরা সেন্টমার্টিনের মিষ্টি ডাবের পানি খুব পছন্দ করেন। আমরা চাই দ্বীপের এই সবুজ রূপ যেন চিরকাল টিকে থাকে।’

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ‘সেন্টমার্টিন বা নারকেল জিনজিরার ভূপ্রকৃতি টিকিয়ে রাখতে নারকেল গাছের শিকড় মাটির ঢাল হিসেবে কাজ করে। আমরা ইতিমধ্যে দ্বীপের সুরক্ষায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া যেকোনো ধরনের পাকা স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করেছি। দ্বীপে পর্যটক নিয়ন্ত্রণ এবং প্লাস্টিক বর্জন নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, ‘আমরা দ্বীপের নারকেল গাছের রোগ বালাই দমনে ফেরোমন ফাঁদ ও পরিবেশবান্ধব বালাইনাশক ব্যবহারের জন্য স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। একই সঙ্গে নারকেল জিনজিরার আদি রূপ ফিরিয়ে আনতে লবণাক্ততা সহনশীল উন্নত জাতের নতুন ৫ হাজার নারকেল চারা রোপণের একটি বিশেষ প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী জানান, ‘সেন্টমার্টিন আমাদের দেশের একটি অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ। আমরা দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আসন্ন পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত যেন নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক হয়, সে লক্ষ্যে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। পরিবেশের ক্ষতি না করে কীভাবে ইকো-ট্যুরিজম নিশ্চিত করা যায়, সে ব্যাপারে আমরা কঠোর মনিটরিং রাখব। প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ ও অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে আমাদের তদারকি অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং দ্বীপের বাসিন্দাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই একটি চমৎকার ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন পরিবেশ গড়ে তোলা হবে।’

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন আবারও তার সমস্ত রূপ-লাবণ্য নিয়ে সেজে উঠছে ভ্রমণপিপাসুদের স্বাগত জানাতে। প্রকৃতির এই অপার সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রেখেই উপভোগ করাই হোক এবারের পর্যটনের মূল লক্ষ্য।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত