বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে উত্তরণের পথ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারে দেশের জ্বালানি খাতে গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং গ্রিন ট্রানজিশনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জামাল নজরুল ইসলাম বিজ্ঞান ভবনের ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং গ্যালারি রুমে ‘দ্য ক্লিন এনার্জি হরাইজন: অ্যাডভান্সিং পাওয়ার ইনোভেশন অ্যান্ড গ্রিন টেকনোলজিস’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিল (বিইপিআরসি) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) যৌথভাবে এর আয়োজন করে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিইপিআরসির চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন, এনডিসি। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইকিউসির পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আবু রেজা। স্বাগত বক্তব্য দেন আইকিউসির অতিরিক্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মনিমুল হক।
আয়োজকরা জানান, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও গ্রিন টেকনোলজির অগ্রগতি, বিদ্যুৎ খাতে উদ্ভাবন এবং বাংলাদেশের টেকসই জ্বালানি রূপান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যেই সেমিনারটির আয়োজন করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিরা অংশ নেন।
সেমিনারের টেকনিক্যাল সেশনে দেশের জ্বালানি খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বিইপিআরসির পরিচালক (ইনোভেশন) ড. হাসান মাহমুদ কাউন্সিলের পরিচিতি ও কার্যক্রম তুলে ধরেন। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সালমা সুলতানা বাংলাদেশের গ্যাস খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও টেকসই জ্বালানিতে উত্তরণের বিষয়ে আলোচনা করেন।
এ ছাড়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের এনার্জি সিকিউরিটি, এক্সপ্লোরেশন ও গ্রিন ট্রানজিশন নিয়ে বক্তব্য দেন। পরে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে ওপেন ডিসকাশন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিইপিআরসি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে গবেষণার জন্য বরাদ্দ খুবই কম। ভালো গবেষণার জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায় না। কিছু প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফান্ড দেয়, যা বড় পরিসরের গবেষণার জন্য যথেষ্ট নয়। বিইপিআরসি বর্তমানে প্রাথমিকভাবে গবেষণার জন্য ৪ কোটি টাকা ফান্ড করছে।
তিনি বলেন, গবেষণার উদ্দেশ্য শুধু মানসম্মত জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করা নয়, বরং গবেষণার ফল দেশের ও জনগণের কী উপকারে আসবে, সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষণায় ব্যর্থতা স্বাভাবিক। কোনো গবেষণা ব্যর্থ হলেই অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাবে—এমনটি ভাবার কারণ নেই। তবে গবেষকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টা প্রত্যাশা করি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মানসম্মত গবেষকের ঘাটতি থাকা বিস্ময়কর। একই দেশের মানুষ বিদেশে গিয়ে ভালো গবেষণা করতে পারলে দেশে কেন পারবে না। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে গবেষণা প্রস্তাব তৈরির ক্ষেত্রেও কিছু ঘাটতি রয়েছে। অনেক গবেষকই গবেষণার অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানেন না। তাই গবেষণার সুযোগ আরও বিস্তৃত ও সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতীতে নেওয়া বিভিন্ন নীতি ও চুক্তির প্রভাব আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত নতুন ধারণা ও প্রযুক্তিকে বাস্তব প্রয়োগের পাশাপাশি বাজারজাত করার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি সহায়তা ও অনুদানের মাধ্যমে এসব উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেওয়া গেলে দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়বে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
আইকিউসির পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আবু রেজা বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। তেল, গ্যাস ও এলপিজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দেশের ভবনগুলোর ছাদ কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে বিদ্যুতের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতাও বাড়বে।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি এর সংরক্ষণ বা স্টোরেজ সক্ষমতা তৈরি করাও বড় চ্যালেঞ্জ। উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পাশাপাশি নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে তা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। তবে ভবিষ্যতের জন্য বিদ্যুৎ সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে গবেষণাকে আরও বাস্তবমুখী করতে হবে।
সেমিনারে বক্তারা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টেকসই জ্বালানির ব্যবহার, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, গবেষণা এবং গ্রিন ট্রানজিশনের ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানের শেষে অতিথিদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউসির অতিরিক্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন।
অগ্রণী ব্যাংকের টেকসই ব্যাংকিংবিষয়ক সেমিনার