জুলাই যোদ্ধাকে ‘যুবলীগ কর্মী’ বানিয়ে জেলে পাঠাল পুলিশ!

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

গাজীপুরের শ্রীপুরে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ক্ষিপ্ত হয়ে সরকার ও সরকারপ্রধানকে ‘অশ্লীল ভাষায়’ গালাগালি করার পর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এক নেতা আশরাফুল ইসলাম সজলকে (২৬) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারিতে আন্দোলন করার অনেক প্রমাণ থাকার পরও তাকে যুবলীগ কর্মী আখ্যা দিয়ে মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়েছে পুলিশ।

আশরাফুল ইসলাম বরমী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বরামা গ্রামের ইমতিয়াজ উদ্দীনের ছেলে। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উপজেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সজল রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় থাকতেন। সেই সময় থেকে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে যোগ দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে। তার ফেসবুক প্রোফাইলে এ-সংক্রান্ত অনেক ছবি ও ডকুমেন্ট দেখা গেছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দেওয়ার একটি ভিডিও পোস্ট করেন এই তরুণ।

এনসিপির স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, আশরাফুল ইসলাম সজল দলটির সক্রিয় নেতা। তাকে গ্রেপ্তারের পরের দিন রাতে বরমী বাজারে বিক্ষোভ মিছিল করেন এনসিপির নেতাকর্মীরা। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে লড়াই করেছেন বলেও নিশ্চিত করেন দলটির নেতারা। তাদের দাবি, সজল সম্মুখসারির জুলাই যোদ্ধা। সব আন্দোলন-সংগ্রামের ছবি, ফুটেজ ও ভিডিও সবাই দেখেছে। পুলিশের দায়ের করা মামলার নথিতে আশরাফুল ইসলামকে যুবলীগ কর্মী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে নিজ বাড়ি থেকে আশরাফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা পুলিশের নথিতেই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে ‘যুবলীগ কর্মী’ উল্লেখ করা হয়।

পুলিশের ফরোয়ার্ডিংয়ে আশরাফুল ইসলাম সজলের নামের পর বন্ধনীর মধ্যে ‘যুবলীগ কর্মী’ লেখা রয়েছে। একই নথিতে মামলার আরেক আসামি নাঈমকে ‘সাবেক ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আশরাফুলকে যুবলীগ কর্মী হিসেবে উল্লেখ করার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি পুলিশের নথিতে। এনসিপির উপজেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত নেতাকে ‘যুবলীগ’ বলে মামলা দেওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ফরোয়ার্ডিংয়ে আশরাফুলসহ অন্যদের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের মিছিল-মিটিং এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর রাতে শ্রীপুরের জৈনাবাজার এলাকায় মশালমিছিলের ঘটনায় করা মামলায় তাঁদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুলিশের নথিতে বলা হয়েছে, ওই ঘটনায় জড়িতদের ধরতে অভিযান চালিয়ে আশরাফুলসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করে আদালতে পাঠানো হয়।

আশরাফুলকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর বিদ্যুৎ বিলসংক্রান্ত একটি ফেসবুক পোস্ট নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। তবে পুলিশের বক্তব্য, ওই পোস্টের কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি; সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জানতে চাইলে শ্রীপুর উপজেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক আবু রায়হান মেজবাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একজন সম্মুখসারির যোদ্ধাকে ধরে যুবলীগ কর্মী উল্লেখ করে মামলা দিল পুলিশ। সভ্য দেশে এটাও আমরা দেখছি। তার অভিযোগ, পুলিশ কি সেই আগের মতো গায়েবি মামলা দেওয়া শুরু করল কি না? চোখের সামনে একজন মানুষকে তার মতের বিপরীত রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। আমরা নিশ্চিত করেছি, সে আমাদের ইউনিটের নেতা। তবুও পুলিশ আগের রূপেই ছিল। ভিন্নমত দমনে কাজ করছে। আমরা এখন আদালতের মাধ্যমে আমাদের নেতাকে মুক্তির চেষ্টা করছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির অপর এক নেতা বলেন, আমরা এখন ভয়ে আছি। এখন কথা বলতেও ভয় লাগে। সেই আওয়ামী স্টাইলে দেশ চালানো শুরু হলো কি না। শ্রীপুরে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ প্রায়ই মিছিল করে, কিন্তু পুলিশ ঠেকাতে পারে না। আমার সন্দেহ হয়, সেই ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত করার প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করল কি না।

আশরাফুল ইসলামের মা আসমা আক্তার জানান, তার ছেলেকে ২৭ জুলাই গভীর রাতে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের সময় কারণ জানানো না হলেও পরে পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে পোস্ট করার কারণে সে গ্রেপ্তার হয়েছে। তিনি দাবি করেন, তার ছেলে সহজ-সরল। পোস্ট ভুল হয়েছে বুঝে পরে সেটা সরিয়ে নিয়েছে। তবুও গ্রেপ্তার করা হলো।

মামলার বাদী শ্রীপুর মডেল থানার এসআই মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের কাছে এনসিপি নেতা কীভাবে যুবলীগ কর্মী হলেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে ওসি মহোদয় বিস্তারিত বলবেন।

শ্রীপুর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ শাহীনুর আলম জানান, তাকে নাশকতা ও সন্ত্রাস দমন আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এনসিপি নেতা কী করে যুবলীগ কর্মী হলেন—এমন প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত