বাংলাদেশের জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ অনুযায়ী, ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিকে প্রবীণ বা সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৯ শতাংশের বেশি মানুষ ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী। ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী জনগোষ্ঠীর হার ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ দেড় কোটির বেশি মানুষ ষাটোর্ধ্ব।
অন্যদিকে, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের একটি গবেষণার ভূমিকা অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে প্রায় একজনের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি হতে পারে। ইউএনএফপিএর তথ্যমতে, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো জন্মহার কমে আসা, মৃত্যুহার হ্রাস এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি।
বর্তমানে বিশাল এই জনগোষ্ঠী নানা ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। অধিকাংশ প্রবীণের দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, কথা বলার সক্ষমতা, দৈহিক তৎপরতা ও চলাচলের ক্ষেত্রে দুর্বলতা দেখা যায়। বয়সের সঙ্গে বিভিন্ন রোগের ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। অনেক প্রবীণ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ, বাত, হাঁপানি ও শারীরিক দুর্বলতাসহ বিভিন্ন অসুস্থতায় ভুগছেন।
অন্যদিকে, প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনো পর্যাপ্ত নয়। একজন ৭২ বছর বয়সী রোগীর একই সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হতাশা ও চোখের সমস্যা থাকতে পারে। এ ধরনের রোগীর জন্য প্রয়োজন জেরিয়াট্রিক অ্যাসেসমেন্ট, মেডিকেশন রিভিউ, রিহ্যাবিলিটেশন, নিউট্রিশন, ফিজিওথেরাপি, মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং এবং পারিবারিক সহায়তার মতো সমন্বিত সেবা। কিন্তু বাংলাদেশে এসব সেবা এখনো অপ্রতুল।
এ ছাড়া যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গড়ে ওঠার ফলে শহর ও গ্রামের অনেক প্রবীণই নানা ধরনের অবহেলার শিকার হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে ঘুমের সমস্যা, শারীরিক অপরিচ্ছন্নতা, অপরিষ্কার পোশাক ও অস্বাস্থ্যকর বিছানাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়।
অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা
বর্তমানে প্রবীণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বড় যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা হলো অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা। বিশেষ করে বাংলাদেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ বৃদ্ধ বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক অবসরকালীন পেনশন পান না। নিয়মিত আয়ের অভাবে বৃদ্ধ বয়সে এ জনগোষ্ঠীর অনেকেই সন্তান বা আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে নাগরিকদের।
এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য সবচেয়ে বড় সরকারি নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোর একটি হলো বয়স্ক ভাতা। বর্তমানে মাসিক ৬৫০ টাকা হিসাবে একজন ভাতাভোগী দৈনিক গড়ে প্রায় ২১-২২ টাকা পান। যদিও সব প্রবীণ এই ভাতা পান না। ফলে এটি প্রবীণের পূর্ণ জীবনযাপনের ব্যয় বহন করার মতো পেনশন নয়; বরং সীমিত পরিসরে সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থার একটি অংশ।
একাকিত্ব ও মানসিক সংকট
প্রবীণদের অন্যতম বড়, কিন্তু অনেক সময় অদৃশ্য সমস্যা হলো একাকিত্ব। দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব থেকে তাঁদের মধ্যে হীনমন্যতা ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হতে পারে।
সন্তান কর্মসংস্থানের জন্য অন্য শহরে পাড়ি জমানো বা বিদেশে চলে যাওয়া, জীবনসঙ্গীর মৃত্যু, বন্ধুবান্ধব ও সমবয়সীদের মৃত্যু, অবসরের পর কর্মক্ষেত্রের সামাজিক যোগাযোগ হারিয়ে ফেলা এবং চলাফেরা কমে যাওয়া—এসব কারণ প্রবীণদের একাকিত্ব বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
প্রবীণ নির্যাতন
বাংলাদেশে প্রবীণ নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগের বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক নির্যাতন, গালিগালাজ, অপমান, অর্থ কেড়ে নেওয়া, সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ, চিকিৎসা না করানো, খাবার বা ওষুধ না দেওয়া, ইচ্ছার বিরুদ্ধে একা রাখা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং অবহেলা।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রবীণ নির্যাতনের সঙ্গে সম্পত্তির বিরোধ, উত্তরাধিকার, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং আর্থিক নির্ভরতার বিষয়গুলোও যুক্ত হতে পারে।
দুর্যোগে প্রবীণদের ঝুঁকি
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা নদীভাঙনের সময় প্রবীণরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। দ্রুত চলাচলে অক্ষমতা, নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন, দীর্ঘস্থায়ী রোগ, অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে না পারা এবং সহায়ক যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কারণে দুর্যোগের সময় তাঁদের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এর পাশাপাশি অপুষ্টি, পড়ে গিয়ে আহত হওয়া, প্রতিবন্ধকতা ও চলাচলে সমস্যা, ডিজিটাল বৈষম্য এবং প্রবীণদের ‘বোঝা’ হিসেবে দেখার প্রবণতাও তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সম্ভাব্য করণীয়
প্রবীণদের সমস্যা সমাধানে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। বয়স্ক ভাতা, পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করতে হবে, যাতে প্রবীণদের অন্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে না হয়।
দ্বিতীয়ত, প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সহজলভ্য চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
তৃতীয়ত, পরিবারের ভূমিকা শক্তিশালী করতে হবে। প্রবীণদের সময় দেওয়া, তাঁদের মতামতের মূল্য দেওয়া এবং পারিবারিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখলে একাকিত্ব ও মানসিক চাপ কমতে পারে।
চতুর্থত, সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। প্রবীণ ক্লাব, সামাজিক মিলনকেন্দ্র, বিনোদনমূলক কার্যক্রম এবং স্থানীয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এতে তাঁরা সক্রিয় ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারবেন।
পঞ্চমত, নির্যাতন ও অবহেলা রোধ করতে হবে। প্রবীণদের আইনি সুরক্ষা, সচেতনতা এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রবীণদের বোঝা হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন ও অভিজ্ঞ নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগেই তাদের মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্য নিশ্চিত করা সম্ভব।
সর্বোপরি, নতুন প্রজন্মকে বার্ধক্য সম্পর্কে সচেতন ও প্রস্তুত করে তুলতে হবে। কারণ আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের জন্য একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা শুধু তাঁদের দায়িত্ব নয়—এটি পুরো সমাজের ভবিষ্যতের সঙ্গেও সম্পর্কিত।