বিশ্ববিদ্যালয়

ভবিষ্যৎ গড়ার মজবুত ভিত্তি করুন

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪০ এএম

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানই নয় এ হলো এমন এক ক্ষেত্র, যা জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি বিকাশ ও মানবসত্তার উৎকর্ষ সাধনের উর্বর ভূমি। খ্যাতিমান ইংরেজ কবি, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার জন মেসফিল্ড যথার্থই বলেছেন, ‘পৃথিবীর এমন কিছু সুন্দর জিনিস আছে, যার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে অজ্ঞতাকে যারা ঘৃণা করে তারা জানার জন্য সংগ্রাম করে, যারা সত্যকে উপলব্ধি করে তারা অন্যদের তা দেখতে বাধ্য করার চেষ্টা করে।’ ১ অক্টোবর দেশ রূপান্তরে ‘দেশের চার বিশ্ববিদ্যালয় ১০০০-এর মধ্যে’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি মেসফিল্ডের উক্তিটি সামনে নিয়ে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশনের ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ২০২৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথভাবে শীর্ষস্থানে রয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি। এই চার বিশ্ববিদ্যালয় বৈশি^ক তালিকায় ৮০১-১০০০ ব্যান্ডের মধ্যে অবস্থান করছে। এ তালিকায় বাংলাদেশের মোট ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। র‌্যাংকিংয়ে ১০০০-এর মধ্যে নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় । এ দুটি ১০০১ থেকে ১২০০ ব্যান্ডের মধ্যে রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর টাইমস হায়ার এডুকেশনের ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশিত হয়।

র‌্যাংকিংয়ে আমাদের যে পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশি^ক তালিকায় ৮০১-১০০০ ব্যান্ডের মধ্যে স্থান অর্জন করেছে, এ জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্র্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমরা অভিনন্দিত করি। কিন্তু আমরা এও মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান মেনে নেওয়া কষ্টকর। অনস্বীকার্য যে, দেশের শীর্ষ এই দুটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ ও গুণগত মানের বিষয়ে দেশেই কিছু প্রশ্ন আছে। কিন্তু এরপরও আমরা বিশ্বাস করি, বৈশ্বিক তালিকায় এতটা পেছনে পড়ার মতো নিম্নগামিতা দুটির কোনোটিরই ক্ষেত্রেই ঘটেনি। দেশের উচ্চশিক্ষা ও অনেক পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, পরিবেশ  নিয়ে বিতর্ক-আশঙ্কার প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনের কারণগুলো সচেতন মানুষ মাত্রেরই কমবেশি জানা। শিক্ষার মান ও পরিবেশ মিশ্র পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কেন যাচ্ছে, এর উত্তর সন্ধান করে যথাযথ প্রতিবিধানের তাগিদ আমরা ইতিপূর্বে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই দিয়েছি। অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ প্রশাসনিক সংস্কারের কথাও বলেছি।

নেতিবাচক রাজনীতি কিংবা নানামাত্রিক মেরুকরণের সমীকরণ  আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কখনো কখনো কদর্যভাবে দৃশ্যমান হয়েছে  এবং এর প্রতিফল বহুলাংশেই হয়ে দাঁড়িয়েছে চরম ক্ষতিকর। এর পাশাপাশি অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের কারণে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বমানের গবেষণা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে, তাও সত্য। অনেক ক্ষেত্রেই  সনাতন পাঠদান পদ্ধতি আধুনিক যুগের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনেকটা পিছিয়ে রেখেছে এই অভিযোগও অমূলক নয়। ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি স্থান হওয়া উচিত, যা আলো, স্বাধীনতা এবং শিক্ষার কেন্দ্র’ প্রভাবশালী ইংরেজ ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্ববিদ এবং সাহিত্যিক জন হেনরি নিউম্যানের এই মন্তব্যও প্রণিধানযোগ্য। আমরা স্পষ্টতই মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এমন একটি জায়গা যেখানে প্রজন্ম জ্ঞান অর্জন, বন্ধুত্ব তৈরি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। এর জন্য সর্বাগ্রে জরুরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উর্বরতা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এর অনুকূলে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মুঞ্জরি কমিশন কতটা কি করছে? একটি বৃক্ষের যথাযথ প্রতিপালনেই বৃক্ষটি পল্লবিত এবং ফলবান হওয়ার উপযুক্ত হয়ে ওঠে।

রাজনীতিক, বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রপ্রধান এবং কূটনীতিক সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক উক্তিটি আরও প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘জ্ঞানে একটি বিনিয়োগ সর্বোত্তম সুদ প্রদান করে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবন উৎকর্ষ  করার এবং ভবিষ্যৎ গঠনের শক্তি অর্জনের পথ যেন কণ্টকিত না হয়, বরং তা কীভাবে একেবারে নিষ্কণ্টক করা যায় মনোযোগ গভীর করা বাঞ্ছনীয় সেদিকে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে জীবনের ক্যানভাস করা হোক, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের স্বপ্ন আঁকতে পারে এবং এর বাস্তবায়নে পায় যথাযথ সহযোগিতা। এও মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্যিকারের সৌন্দর্য তার কৌতূহল জাগিয়ে তোলা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার মধ্যে নিহিত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভবিষ্যৎ গড়ার মজবুত ভিত্তি হিসেবে নিশ্চিত করার দায়দায়িত্ব যাদের, তারা যেন কোনোভাবেই বিস্মৃত না হন, শিক্ষা মানে শুধু জীবনের জন্য প্রস্তুতি নয়, বরং শিক্ষাই জীবন। বৈষম্যের ছায়া সরিয়ে সমতার প্রয়াস করতে হবে গতিশীল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত