জীবনের পথচলায় আমরা অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই। কেউ আসে কিছু সময়ের জন্য, কেউ হয়ে ওঠে আপনজন, আবার কেউ নিঃশব্দে আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হয়ে যায়। কিন্তু সব মানুষকে প্রয়োজনের সময়ে পাশে পাওয়া যায় না। সুখের দিনে চারপাশে মানুষের ভিড় থাকলেও দুঃখের দিনে, বিপদের মুহূর্তে কিংবা কঠিন সিদ্ধান্তের সময়ে প্রকৃত মানুষগুলোকে চিনে নেওয়া যায়। কারণ সুখের সময়ে পাশে থাকা সহজ, কিন্তু দুঃসময়ে হাত বাড়িয়ে দেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। আবার অনেকের কাছে অনেকেই হয়ে ওঠেন প্রয়োজনের প্রিয়জন। প্রয়োজনের প্রিয়জন হওয়াটা খুব কষ্টের, অন্তত অনুভূতিসম্পন্ন মানুষের কাছে।
আমাদের সমাজ বাস্তবতায় প্রীতিকর ঘটনা কিংবা বিষয়ের চেয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা বিষয় খুব অনাকাক্সিক্ষতভাবে সামনে চলে আসে, যার অনেক বিরূপ প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠে খুব কদর্যভাবে। মানুষের চাহিদায় প্রয়োজন ফুরোবার নয়, প্রয়োজনের পরিসর অসীম। নিজের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলেও যে পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সে-ই তো প্রিয়জন। প্রিয়জন হওয়ার জন্য যারা চাহিদার প্রয়োজন হয়ে পাশে থাকবে, চাহিদা পরিপূর্ণ করে সে নিশ্চয়ই দূরে চলে যাবে একসময়। এমনটাই দেখা যাচ্ছে বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে প্রতিনিয়ত হৃদয় আসনে বিরাজ করে কেবল নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রিয়জন। সেসব ভালোবাসা অনেকটাই মায়ের নিঃস্বার্থ নিবেদিত ভালোবাসার মতো।
যে মানুষটি আমার/আপনার ভালো-মন্দের কথা ভাবে, হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্টটুকুও বুঝতে পারে, বিপদের সময় কোনো স্বার্থ ছাড়াই পাশে এসে দাঁড়ায়, সেই মানুষটিই সত্যিকার অর্থে আপন। প্রয়োজনের সময়ে তার একটি কথা, একটু সাহস কিংবা সামান্য সহযোগিতাও অনেক বড় আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। কখনো কখনো একজন মানুষের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকাটাই হয়ে যায় সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা। সে হয়তো আপনার/আমার সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে না, কিন্তু তার উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয়, এই বিপুল পৃথিবীতে আমি/আপনি একা নই। জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন চারপাশের অনেক পরিচিত মানুষকেও অচেনা মনে হয়। ফোনের ওপাশে থাকা মানুষগুলো ব্যস্ততার অজুহাতে দূরে সরে যায়, কেউ কেউ পরিস্থিতি বুঝেও নীরব থাকে। আবার এমন একজন মানুষও থাকে, যার সঙ্গে হয়তো প্রতিদিন কথা হয় না, নিয়মিত যোগাযোগও নেই; অথচ তোমার বিপদের কথা শুনে সে সবার আগে পাশে এসে দাঁড়ায়। তখনই বোঝা যায়, সম্পর্কের গভীরতা প্রতিদিনের কথাবার্তায় নয়, বরং প্রয়োজনের মুহূর্তে তার প্রকাশ ঘটে।
কিন্তু সময় বড় অদ্ভুত। প্রয়োজনের সময় যাকে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মনে হয়, প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে অনেক সময় তাকেই আমরা ভুলে যাই। ব্যস্ততা, নতুন সম্পর্ক কিংবা জীবনের নানা হিসাবের ভিড়ে সেই মানুষটির অবদান ধীরে ধীরে মøান হয়ে যায়। অথচ মনে রাখা উচিত, মানুষের মূল্য শুধু প্রয়োজনের মুহূর্তে নয়, প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পরও তার প্রাপ্য সম্মান ও কৃতজ্ঞতার মধ্যেই প্রকাশ পায়। কেউ যদি তোমার দুঃসময়ে নিজের সময়, শ্রম কিংবা সামর্থ্য দিয়ে তোমার পাশে দাঁড়ায়, তবে সেই সহযোগিতাকে কখনোই ছোট করে দেখা উচিত নয়। কারণ মানুষের দেওয়া সাহায্যের মূল্য সবসময় অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি সাহসের কথা কখনো একজন ভেঙে পড়া মানুষকে আবার দাঁড়ানোর শক্তি দিতে পারে। আন্তরিক খোঁজ নেওয়া কখনো গভীর একাকিত্ব দূর করতে পারে। আর বিপদের সময়ে বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাত কখনো সারাজীবনের স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে।
জীবনে যারা নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকে, তাদের কখনো প্রয়োজনের মানুষ হিসেবে নয়, মূল্যবান মানুষ হিসেবে মনে রাখা উচিত। কারণ প্রয়োজন একদিন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একজন ভালো মানুষের দেওয়া ভালোবাসা, সাহস ও সহযোগিতার ঋণ সহজে শেষ হয় না। প্রিয়জন শুধু প্রয়োজনের মানুষ নন, জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ। প্রয়োজনের সময়ে পাশে পাওয়া মানুষটিকে প্রয়োজন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দূরে সরিয়ে দেওয়া মানবিকতার পরিচয় নয়। বরং প্রয়োজন শেষ হওয়ার পরও তার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা ধরে রাখাই সত্যিকারের সম্পর্কের পরিচয়।
জীবনে অনেক মানুষ আসে, আবার অনেক মানুষ সময়ের স্রোতে হারিয়েও যায়। কিন্তু যারা দুঃসময়ে পাশে থাকে, তাদের জায়গা হৃদয়ের গভীরে আলাদা করে রাখা উচিত। কারণ সুসময় আমাদের অনেক মানুষকে চিনিয়ে দেয়, কিন্তু দুঃসময় চিনিয়ে দেয়, কে সত্যিই আমাদের মানুষ। জীবনের প্রয়োজনে পাওয়া মানুষ অনেক হতে পারে, কিন্তু প্রয়োজন ছাড়াই পাশে থাকা মানুষই আসলে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সমাজে-পরিবারে বিভাজন বাড়ছে। দ্বন্দ্ব-সংঘাত-কলহ-বিবাদ অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। হীনস্বার্থের পরিসর বাড়ছে কদর্যভাবে। কিন্তু সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক কিংবা বন্ধনের তো বিকল্প নেই। পরিবারে-সমাজে এর আলো যত ছড়াবে ততই বিকশিত হবে প্রজন্ম।
অগ্রজদের এমন কিছু করা সমীচীন নয়, যা অনুজদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমনিতেই তো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সীমা নেই, হতাশার প্রলম্বিত ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে অনেক সম্ভাবনা। এই প্রেক্ষাপটে মৈত্রী-সম্প্রীতির উৎকর্ষতা খুব জরুরি। আমরা যদি এই বাস্তবতা মেনে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ক্ষুদ্র ভূমিকাও রাখি এর ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চয় সবার জন্যই হবে সুখকর। সময় মনে হচ্ছে এ ব্যাপারে সতর্ক-সজাগ হওয়ার তাগিদই দিচ্ছে। আলোয় আলোয় ভরে থাক পরিপাশর্^। আমরা যেন হই একে অন্যের নির্ভরতা-আশ্রয়ের ক্ষেত্র। সবার প্রচেষ্টায় দূর হোক সব বিবর্ণতা। শান্তি-স্বস্তি-নিরাপদ ক্ষেত্র হোক সমাজ।
লেখক : স্বত্বাধিকারী, উষার স্বাদকাহন