প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, তার সরকার সর্বশক্তি দিয়ে সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে এবং দেশে পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ধ্বংসকৃত আইনের শাসন পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠা করবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ফেনীর পরশুরাম উপজেলার খেয়াঘাট-মুহুরী সেতু এলাকায় মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্প পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়) উদ্বোধন শেষে আয়োজিত জনসভায়
বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে আমরা দেখেছি কীভাবে আইনের শাসনকে ধ্বংস করা হয়েছে। আমরা সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে চাই এবং ধীরে ধীরে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কর্মকা-ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু গোষ্ঠী বিভিন্ন ‘অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা’কে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের প্রচেষ্টা সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি জনগণের জন্য নেওয়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল ও নদী খনন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ এবং বন্ধ মিল-কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব কাজে যদি বাধা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে ক্ষতি কার হবে? এ দেশের জনগণেরই ক্ষতি হবে। সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির প্রসঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে ১৫০-তে উন্নীত করা হবে।
তারেক রহমান বলেন, এর ফলে বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন না হলে মানুষকে চিকিৎসার জন্য উপজেলা থেকে জেলা শহর কিংবা ঢাকায় ছুটতে হবে না এবং নিজ এলাকার কাছাকাছি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়া সম্ভব হবে।
পরশুরামের ৫০ শয্যার হাসপাতালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে হাসপাতালটির প্রথম ৩০টি শয্যা স্থাপন করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ৫০-এ উন্নীত করা হয়। তিনি বলেন, হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি আমার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে এর পরিবর্তে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ১৫০-তে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
কর্মজীবী পরিবারের নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিও এগিয়ে নিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার ইতিমধ্যে সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে।
মুহুরী-কহুয়া প্রকল্প প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বৃহত্তর খাল ও নদী পুনঃখনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে মুহুরী ও কহুয়া নদীর সংযোগকারী খালটি পুনঃখননের কাজ শুরু করেছে। তিনি বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকার প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, গত ১৭ বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া মিল ও কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার জন্য সরকার কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান বাড়লে ধীরে ধীরে পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে, মানুষ আরও স্বনির্ভর হবে এবং তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে। প্রধানমন্ত্রী দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষায় জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান। তিনি অঙ্গীকার করেন, ‘যেকোনো মূল্যে’ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হবে।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী এবং ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আউয়াল মিন্টু, পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুন্সী রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন ও সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের উদ্বোধন : এর আগে ফেনীর দীর্ঘদিনের বন্যা, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি খেয়াঘাট ঘাট-মুহুরী সেতু এলাকায় একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে মাটি কেটে প্রকল্পের আওতায় একটি খাল পুনঃখননের কাজ উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু অপসারণ করে নদী খনন এবং বাঁধ নির্মাণকাজও উদ্বোধন করেন।
প্রকল্পের আওতায় ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ এবং ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখননের কাজ করা হবে। একই সঙ্গে ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন : বিকেলে ফেনীর ফুলগাজীতে অবস্থিত বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি কর্মসূচির উদ্বোধন ও অনুষ্ঠান শেষে কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে, তিনি বেগম খালেদা জিয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে এজন্য ভালো ও গুণগত ফলাফলের শর্ত জুড়ে দেনে। পরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কলেজ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন।