মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্টের ৮ নম্বর রোডের মিজান সুপার স্টোর। সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ শফিুকুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা দোকানি মিজানুর রহমানের কাছে জানতে চাইলেন প্যাকেটের চিনির দাম কত। উত্তরে দোকানি জানান ‘গায়ের রেট ১১০ টাকা, নিতে হলে ১২০ টাকা দিতে হবে।’ শুনেই ক্রেতা খানিকটা মন খারাপ করে চিনি না কিনেই দোকান থেকে বেরিয়ে যান।
অর্থাৎ এক কেজি প্যাকেটের চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১১০ টাকা হলেও খুচরা দোকানিরা ১২০ টাকা দাম চাইছেন। এই ক্রেতা বলেন, এমনিতেই সব জিনিসের দাম বেশি। তারপরও যদি সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের বেশি দাম চাওয়া হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। বিষয়গুলো সরকারের কঠোরভাবে নজরদারি করা উচিত।
কেন বাড়তি দাম চাইছেন জানতে চাইলে বিক্রেতা মিজানুর রহমান জানান, এক কেজি চিনিতে বিক্রেতার কমিশন নেই বললেই চলে। সেক্ষেত্রে আমাকে তো ব্যবসা করতে হবে। তা না হলে লোকসান গুনতে হবে। একদিকে চিনি-তেলের সরবরাহ কম, অন্যদিকে কমিশন নেই। তাই ক্রেতার কাছ থেকে লাভ তুলে নেওয়া।
এই অবস্থা শুধু চিনির ক্ষেত্রেই নয়, সয়াবিন তেলেও। পণ্যটি বাজারে নেই বললেই চলে। যেসব খুচরা দোকানির কাছে তেল থাকে, তা এখন ক্রেতার চোখে দেখা যাবে এমন স্থানে নেই। এই সুযোগে দামও বাড়তি। সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য মানা হচ্ছে না।
ডিআইটি প্রজেক্টের ৭ নাম্বার রাস্তার আরও একটি দোকান শাহীন সুপার শপ। দোকানি প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের বোতল বিক্রি করছেন ২১০ টাকায়, অথচ সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২০৪ টাকা। কদিন আগেই সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কিন্তু ব্যবসায়ীরা চাইছেন আরও দাম বাড়িয়ে নিতে। এ জন্য পুরনো ঢঙে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করছেন।
কেন বেশি দামে সয়াবিন বিক্রি করছেন জানতে চাইলে দোকানি শাহিনুল হক দাবি করেন, একদিকে সরবরাহ কম। অন্যদিকে বিক্রেতার কমিশন থাকে এক থেকে দেড় টাকা। এই অবস্থায় বেশি না নিলে পোশায় না।
এই অবস্থা শুধু একটি এলাকার নয়। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার বাড্ডা, রামপুরা, সেগুনবাগিচা, মগবাজারসহ কয়েকটি এলাকার খুচরা দোকান ঘুরে প্রায় একই রকম চিত্র পাওয়া যায়। এর মধ্যে সুপারশপগুলোয় তেল, চিনি পাওয়া গেলে সেটা নির্ধারিত মূল্যেই পাওয়া যাচ্ছে, তবে খুচরা দোকানগুলোয় বাড়তি দামের চিত্র দেখা গেছে।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির যুক্তিতে তেলের দাম বাড়ানোর জন্য এরই মধ্যে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের মামা-ভাগিনা সুপার শপের বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, তেল ও চিনির সরবরাহ কম। আর সেগুলো নিলেও বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। আমাদের লাভের অংশ নাই। যে কারণে কারও কাছে তেল-চিনি থাকলে একটু বাড়িয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে।
বাড়ছে চালের দাম : এদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, পরিমাণে অল্প হলেও চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থাটির তথ্য বলছে, চিকন চালের দাম কেজিতে ২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। জানা গেছে, পরিবহন খরচের কথা বলে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানো শুরু করেছেন। তবে টিসিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ মূল্যের চিকন চালের দাম একই অবস্থায় থাকলেও বেড়েছে চিকন চালের নিম্নস্তরের চালের দাম। এক মাসের ব্যবধানে এই চালের দাম ১ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ফলের ৭০ টাকা কেজি দরে যে চাল পাওয়া যেত তা এখন ৭২ টাকায় উঠেছে।
এদিকে মোটা চালের দাম না বাড়লেও কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে মাঝারি মানের চিকন চালের দাম। টিসিবি বলছে, এই ক্যাটাগরিতে ৫৫ টাকায় যে চাল কেনা যেত, তা কিনতে এখন ৫৮ টাকা লাগছে। তবে এই ক্যাটাগরির উচ্চস্তরের চালের দাম এখনো ৬৫ টাকাতেই আছে। এক মাসের ব্যবধানে এই দাম বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৫০ শতাংশ।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাড়তি পরিবহন খরচের চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সেটা কোনোভাবেই প্রতি কেজি চালে ২ থেকে ৩ টাকা বৃদ্ধির সুযোগ নেই। বরং এ ক্ষেত্রে অন্যায় সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। একইভাবে দাম বাড়লে সব ধরনের চালের দামে প্রভাব পড়ার কথা। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে যদি চিকন চালের দাম বাড়ে তাহলে মোটা চালের দামও বাড়ার কথা। কিন্তু টিসিবির বিশ্লেষণে তা দেখা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিং দরকার, একই সঙ্গে কেউ বাড়তি দাম নিলে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা উচিত।
মুরগি ডিম দাম স্থিতিশীল : সপ্তাহখানেক আগে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনপ্রতি ৫ টাকা বেড়েছে। গত সপ্তাহের মতো গতকালও বাজারভেদে প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। তবে ব্রয়লার মুরগির দাম স্থিতিশীল রয়েছে। ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা কেজি দরেই বিক্রি করতে দেখা গেছে ব্রয়লার মুরগি।
তবে ১০ থেকে ১৫ দিন আগে সবজির দাম বেড়েছিল। এখনো চড়া মূল্যেই সবজি বিক্রি হলেও কোথাও কোথাও সবজিভেদে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত কম দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া আটা ও ময়দা আগের মতোই চড়া মূল্যে বিক্রি করতে দেখা গেছে।