জজ নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম

ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল বিচারক হতে চাই : সিয়াম

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

স্বপ্ন ছিল বিচারকের আসনে বসার। সেই স্বপ্ন পূরণে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে এগিয়ে গেছেন তিনি। নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় এবার প্রথম স্থান অর্জন করেছেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল হক সিয়াম। তার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত প্রস্তুতি, নিরলস পরিশ্রম এবং পরিবারের অনুপ্রেরণা। জজ নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার গল্প নিয়ে দেশ রূপান্তরের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। 

বিচারক হওয়ার স্বপ্ন কখন এবং কীভাবে তৈরি হয়েছিল এমন প্রশ্নে সিয়াম বলেন,  জজ হওয়ার ইচ্ছাটা আসলে হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। আইন পড়তে শুরু করার পর থেকেই বিচার বিভাগ আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করত। একজন বিচারক একই সঙ্গে আইন, যুক্তি, ন্যায়বোধ এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এই চারটি বিষয়কে ধারণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিভিন্ন মামলার রায়, বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং বিচারকদের ভূমিকা নিয়ে পড়তে গিয়ে ধীরে ধীরে মনে হয়েছে, বিচারক হিসেবে নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বটি আমার ব্যক্তিত্ব ও চিন্তার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পরীক্ষা ফল জানার অনুভূতির বিষয়ে সিয়াম বলেন, ‘প্রথমে কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। এরপর আনন্দের পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি একটা গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করেছি। মনে হয়েছে, এই ফল শুধু আমার একার নয়। আমার পরিবার, শিক্ষক, শুভাকাক্সক্ষী এবং যারা পুরো যাত্রায় আমাকে সহযোগিতা করেছেন, সবার সম্মিলিত অবদান এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।’

সাফল্যের খবরটা সবার আগে মাকে জানান সিয়াম। বাবা বাইরে কাজে ছিলেন, পরে তাকে ফোন করে জানানো হয়।

পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয়ে সিয়াম বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন ছিল দীর্ঘ সময় ধরে একই লক্ষ্য ধরে রাখা। একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি কয়েক মাসের বিষয় নয়; দীর্ঘ সময় নিয়মিত পড়াশোনা, নিজের দুর্বলতা নিয়ে কাজ করা এবং বারবার নিজেকে যাচাই করার বিষয়।

বিশেষ করে এমন সময় এসেছে, যখন পড়াশোনা করেও মনে হয়েছে হয়তো যথেষ্ট হচ্ছে না। আবার কখনো কোনো বিষয় প্রত্যাশা মতো ভালো হয়নি। তখন হতাশ না হয়ে কোথায় ঘাটতি আছে সেটা চিহ্নিত করে আবার শুরু করতে হয়েছে। আমি মনে করি, প্রস্তুতির সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল শুধু পড়াশোনা নয়, বরং নিজের ওপর বিশ^াসটা ধরে রাখা।

নতুন করে যারা জজ নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করবে তাদের উদ্দেশে সিয়ামের পরামর্শ হচেছ- 

এটাকে শুধু একটি চাকরির পরীক্ষা হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি হিসেবে নিতে হবে। প্রথমত, আইনের মৌলিক বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে। শুধু ধারা মুখস্থ করলে হবে না, ধারাটির উদ্দেশ্য কী, প্রয়োগ কীভাবে হয়, আদালতের সিদ্ধান্ত কী এবং একটি বিধানের সঙ্গে অন্য বিধানের সম্পর্ক কী এসব বুঝতে হবে।

দ্বিতীয়ত, লিখিত পরীক্ষার জন্য লেখার অনুশীলন করতে হবে। ভালো জানা আর পরীক্ষার খাতায় ভালোভাবে উপস্থাপন করা এক বিষয় নয়।

তৃতীয়ত, প্রতিদিনের পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টা পড়ার লক্ষ্য করে তিন দিন পর থেমে যাওয়ার চেয়ে প্রতিদিন অল্প হলেও নিয়মিত পড়া অনেক বেশি কার্যকর।

চতুর্থত, নিজের ভুলগুলোকে ভয় পাওয়া যাবে না। মডেল টেস্ট, লিখিত পরীক্ষা বা মক ভাইভায় কোথায় ভুল হচ্ছে সেটা বের করে সংশোধন করতে হবে।

সবশেষে বলব, ‘অন্যের প্রস্তুতির সঙ্গে নিজের প্রস্তুতির তুলনা না করে নিজের গতিটা ধরে রাখুন। এই পরীক্ষায় মেধার পাশাপাশি ধৈর্য, ধারাবাহিকতা এবং আত্মবিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সৃষ্টিকর্তার কাছে চাওয়া। তাই নিয়মিত তার কাছে চাইতে হবে, তাকে ডাকতে হবে।

সিয়াম বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হবে একজন ন্যায়পরায়ণ, নিরপেক্ষ এবং দায়িত্বশীল বিচারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। একই সঙ্গে আমি মনে করি, ন্যায়বিচার শুধু সঠিক রায় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সময়মতো বিচার দেওয়া, পক্ষপাতমুক্ত থাকা, আইনকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের প্রতি মানবিক থাকা, সবকিছুই বিচারিক দায়িত্বের অংশ।

আমি বিশ্বাস করি, একজন বিচারকের হাতের কলম একজন যোদ্ধার হাতের তরবারির চেয়েও বেশি ভারী। আর আল্লাহ আমাকে সেই ভার সহ্য করার শক্তি যেন দেন সেই দোয়া সবার কাছে আমি চাই।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত