চুয়েট সংকটের সুরাহা কার হাতে?

নতুন উপাচার্য ড. শেখ শরীফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংকট সমাধানে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। সবকিছু হয়তো দৃশ্যমান হচ্ছে না। অচিরেই কালো মেঘ কেটে যাবে।’

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পদে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন দুই সপ্তাহ পেরিয়েছে। কমপ্লিট শাটডাউনে টানা ১৫ দিনের মতো অচল হয়ে রয়েছে ক্যাম্পাসের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সব কর্মকাণ্ড। একই দাবিতে টানা কর্মবিরতি পালন করে চলেছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা। দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সংকট সমাধানে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, চলমান এই সংকটের সমাধান সরকারের কাছে। সরকার উদ্যোগী না হলে সংকটের সুরাহা হবে না। তবে নতুন উপাচার্য বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৪টি বিভাগে ৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়ছেন। উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধের প্রভাব এখন একাডেমিক কার্যক্রমে পড়ছে।

চলতি বছরের ২৭ জুলাই চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ২১ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই ক্যাম্পাসে অসন্তোষের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। রাতেই বিক্ষোভ মিছিল করেন কয়েক শ শিক্ষার্থী।

পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর সকালে উপাচার্যের পদ থেকে অধ্যাপক আবু সায়েমকে অপসারণের প্রতিবাদে এবং তাঁকে পুনর্বহালের দাবিতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকরাও যুক্ত হওয়ায় আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়।

আন্দোলনের মধ্যেই গত ২৪ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে না এসে অনলাইনে যোগদান করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফুল আলম। এরপর থেকে তিনি সার্কিট হাউসে অবস্থান করছেন। নতুন উপাচার্যের যোগদানের খবর পেয়ে শিক্ষার্থীরা লাল কার্ড দেখিয়ে বিক্ষোভও করেন।

আন্দোলন ক্যাম্পাস পেরিয়ে নগরেও

আন্দোলনের ১৫তম দিনে মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো ক্যাম্পাসের বাইরে এসে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। শতাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে সায়েম স্যারের পুনর্বহালের দাবিতে নানা স্লোগান ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়।

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত চুয়েটে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধের সর্বাত্মক শাটডাউন অব্যাহত থাকবে। তবে জরুরি সেবা, মেডিকেল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা এই শাটডাউনের আওতামুক্ত থাকবে।

শিক্ষার্থীরা জানান, এই আন্দোলন কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও উপাচার্যের পুনর্বহালের দাবিতে কর্মবিরতি, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন।

মানববন্ধনে বলা হয়, অধ্যাপক সায়েম তাঁর মাত্র ৫৬ দিনের স্বল্প মেয়াদে চুয়েটের শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও গবেষণায় নানামুখী ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল কলাবোরেশন অফিস’ স্থাপন, ‘রিসার্চ হাব’ ও ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ তৈরি এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিল্পকারখানাগুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নেন। কোনো কারণ ছাড়া তাঁর এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা ভেঙে দেওয়া চুয়েটের সার্বিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

শিক্ষার্থীরা জোর দিয়ে বলেন, তাঁরা কোনো দল বা ব্যক্তির স্বার্থে আন্দোলনে নামেননি; বরং একটি যৌক্তিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছেন।

তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি সেকেন্ডই মূল্যবান। ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো সংকট নিরসনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। এটা খুবই হতাশাজনক।’

পরীক্ষা স্থগিত, থমকে আছে বেতনও

দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সেশনজটের ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকেরা আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত না থাকায় ৬টি বিভাগের প্রায় ৬টির মতো নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে। সংকটের সমাধান হলে আমার দুই দিনের নোটিশে তিন দিনের মধ্যে পরীক্ষা নিয়ে নিতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘উপাচার্যের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে কারও কথা নেই। সব নিয়ম মেনেই হয়েছে। কিন্তু যাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, তিনি স্বল্প সময়ে অনেক কাজ করেছেন। সবাই মনে করছেন, তিনি থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন হবে।’

এদিকে প্রশাসনিক অচলাবস্থার প্রভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের প্রক্রিয়াতেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। নিয়মিত প্রক্রিয়ায় ব্যাংকে শিট পাঠানো হলেও উপরমহলের নির্দেশনার অজুহাতে বেতন আটকানো হয়েছে বলে শিক্ষক সমিতির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।

চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কর্মবিরতি চলছে। আমরা সরকার ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাদের দাবির বিষয়টি জানিয়েছি। তাঁরা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আমাদের দাবি শুনেছেন। আমরা আশা করছি, দ্রুত আমরা ক্লাসে ফিরতে পারব।’

বেতন-ভাতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বেতনের ক্ষেত্রে উপাচার্যের স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয় না। তবে অন্যান্যবারের মতো যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংকে শিট পাঠানোর পরও আমাদের বেতন হয়নি। ব্যাংক থেকে বলা হয়েছে, তাদের নাকি ওপর থেকে নিষেধ করা হয়েছে।’

সাবেক উপাচার্যরা যা বলছেন

প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবার কথা শুনতে হবে। চুয়েটের এই পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান করা উচিত।’

আরেক সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘শিক্ষকদের কাজ পড়ানো আর শিক্ষার্থীদের কাজ পড়া। পড়াশোনা আর গবেষণার বাইরে তাঁদের অন্য কোনো কাজ নেই। সরকার উপাচার্য পদে কাকে দিয়েছে, সেটা তাঁদের দেখার বিষয় না। পৃথিবীর কোথাও এরকম নজির নেই।’

নতুন উপাচার্য ড. শেখ শরীফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংকট সমাধানে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। সবকিছু হয়তো দৃশ্যমান হচ্ছে না। অচিরেই কালো মেঘ কেটে যাবে।’

সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘আমরা শিক্ষক, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করছি। তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করছি। আমরা সরকারের সিদ্ধান্ত শান্তিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে চাই।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত