ক্ষমা চাই—ক্ষমা

ক্ষমার আকাঙ্ক্ষায় আত্মজিজ্ঞাসা

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম

মানুষ সবসময় ভুল থেকে বেঁচে থাকতে পারে না। কথা, কাজ কিংবা চলাফেরায় অজান্তেই অনেক ভুল হয়ে যায়। তখন মানুষের সামনে একটিই পথ থাকে, নিজের ভুল স্বীকার করে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের ‘ক্ষমা চাই—ক্ষমা’ কবিতায় এই অনুভূতি গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। 

তিনি মহান আল্লাহকে নিয়ে লিখেছন ‘দ্য গ্রেট’ নামে দুই খণ্ডের কাব্যগন্থ। আলোচ্য কবিতাটি এই গ্রন্থেরই অন্তর্ভুক্ত।

দ্য গ্রেট কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ। ছবি : সংগৃহীত

নিজের ইবাদত ও জীবনের নানা ভুলের দিকে তাকিয়ে কবি আত্মতুষ্ট হননি। বরং নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে স্রষ্টার ক্ষমা কামনা করেছেন। কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে অনুতাপ, আত্মসমালোচনা ও ক্ষমার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কবিতাটি উল্লেখ করা হলো-

ক্ষমা চাই—ক্ষমা

আমার প্রার্থনায় জমা হওয়া সব ইবাদত

                   মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে

বিকল শিশুদের মতোন

অসহায় দৃষ্টিতে হতবিহ্বল তাকিয়ে থাকবে অবাক!

অপরিপূর্ণ ইবাদতের ভাষা অনুবাদহীন

জড় পদার্থের মতো দেখব পড়ে থাকবে পাশে।

তার ক্ষমা ছাড়া আমার পার পাওয়ার

কোনো উপায় নেই—কোনো গত্যন্তর নেই

 

প্রতিমুহূর্তে ভুল—জমা হয় ভুলের মশাল,

মশাল যদি দিতে হয়, ফতুর হয়ে যাবে আমার ভাণ্ডার

নিরেট দেউলিয়াতে অভিশপ্ত আমি সহায়সম্বলহীন নিঃস্ব!

তার ক্ষমা ছাড়া আমার আর কোনো দ্বিতীয় পথ নেই

ক্ষমারযোগ্য হওয়ার আজীবন সাধনায় ব্যাপ্ত থেকেও

                           প্রতি পদে পদে করেছি পাপ

কোনোভাবেই পাপের রাস্তা থেকে পা তুলতে পারি না—

ঘর থেকে বের হই—সম্মুখে যন্ত্রণা,

                            বেপর্দার বারি বর্ষণ

অবনত দৃষ্টির দোহাই—ক্ষমা চাই, ক্ষমা

 

কথা বলি—ভুল হয়ে যায়

কারও কারও মনোবেদনার কারণ আমি,

মিষ্টভাষী বচনামৃত ধারণকারীর দোহাই—ক্ষমা চাই, ক্ষমা

নতুন পোশাক পরে রাস্তা কাঁপিয়ে হাঁটি

বিনীত পদক্ষেপের দোহাই—ক্ষমা চাই, ক্ষমা

প্রতিমুহূর্তে ভুল হয়—প্রতিমুহূর্তে ক্ষমা চাই

প্রতিমুহূর্তে পাপ হয়—প্রতিমুহূর্তে ক্ষমা চাই

ক্ষমা চাই—ক্ষমা, ক্ষমারযোগ্য হতে চাই

স্রষ্টার অনুগ্রহ এ-ই—এ জীবনের বড়ো সাফল্য আর কিছু নাই।

কবিতার শুরুতেই কবি নিজের ইবাদতের দিকে ফিরে তাকান। সেখানে আত্মতুষ্টি নেই। আছে ভয় ও অপূর্ণতার উপলব্ধি। মানুষ যত ইবাদতই করুক, নিজের ভুলত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার কারণে তার আমল কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেই প্রশ্ন কবিকে তাড়িত করে।

কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর আত্মজিজ্ঞাসা। ‘আমার প্রার্থনায় জমা হওয়া সব ইবাদত/ মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে’, এই বক্তব্যে কবি নিজের ইবাদতকে এমনভাবে দেখেছেন, যেন তা স্রষ্টার দরবারে উপস্থাপনের পর নিজের অপূর্ণতার কারণেই অসহায় হয়ে পড়ে আছে। ‘বিকলাঙ্গ শিশুর মতোন’ এবং ‘অপরিপূর্ণ ইবাদতের ভাষা অনুবাদহীন’ কথাগুলো ইবাদতের বাহ্যিক পরিমাণের চেয়ে তার অন্তর্গত মান ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নকে সামনে আনে। এখানে বিনয় আছে, আত্মপ্রবঞ্চনা নেই।

এরপর কবিতাটি আরও গভীর আত্মসমালোচনার দিকে এগিয়ে যায়। ‘প্রতিমুহূর্তে ভুল’ এবং ‘প্রতিমুহূর্তে পাপ’ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। মানুষ ইচ্ছা করলেও সবসময় নিজেকে ভুল থেকে মুক্ত রাখতে পারে না। সামাজিক জীবনের নানা পরিস্থিতিতে পাপের সম্ভাবনার মুখোমুখি হওয়ার বিষয় কবিতায় এসেছে খুব সরলভাবে।

‘তার ক্ষমা ছাড়া আমার আর কোনো দ্বিতীয় পথ নেই’ পঙ্‌ক্তিটি কবিতার মূল বক্তব্যকে স্পষ্ট করে। এখানে ‘তার’ বলতে স্রষ্টাকে বোঝানো হয়েছে। কবির কাছে মানুষের যাবতীয় চেষ্টা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। এই উপলব্ধির মধ্যেই কবিতার আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য নিহিত। তবে কবি পাপকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য করে তুলছেন না। বরং পাপ থেকে মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমার যোগ্য হওয়ার সাধনাই তার প্রধান অভিপ্রায়।

কবিতার ভাষা খুব সহজ। সরাসরি বাক্যের মধ্য দিয়ে অনুভূতিকে প্রকাশ করা হয়েছে। ‘ক্ষমা চাই—ক্ষমা’ বাক্যটিতে ‘ক্ষমা’ শব্দের পুনরাবৃত্তি কবিতার প্রধান শিল্পকৌশল। এটি একই সঙ্গে অনুতাপের প্রকাশ, প্রার্থনার ভাষা এবং কবিতার অন্তর্নিহিত সুর। বারবার ফিরে আসা এই উচ্চারণ পাঠকের মনে এক ধরনের আত্মসমর্পণের আবহ তৈরি করে।

শেষের পঙ্‌ক্তি, ‘ক্ষমা চাই—ক্ষমা, ক্ষমার যোগ্য হতে চাই’ কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি। শুধু ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়, মানুষ ক্ষমার যোগ্য হওয়ার চেষ্টাও করবে। আর শেষ পর্যন্ত স্রষ্টার অনুগ্রহকেই কবি জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখেছেন। এর ভেতরে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আছে, তওবার আকাঙ্ক্ষা আছে এবং স্রষ্টার রহমতের প্রতি গভীর প্রত্যাশা আছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত