আধুনিক ও দ্বীনি শিক্ষার সমন্বয়ে ব্যতিক্রমী কওমি মাদ্রাসা গড়ে তুলেছেন লেখক, গবেষক, বহু গ্রন্থপ্রণেতা ও শিক্ষা সংস্কারক মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ। রাজধানীর মাতুয়াইলে তার প্রতিষ্ঠিত জামিয়া কাশিফুল উলুম ইতিমধ্যে কওমি শিক্ষাঅঙ্গনে ব্যতিক্রমী কার্যক্রমের কারণে সবার নজর কেড়েছে। এখানে ইসলামি জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বাস্তবমুখী শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। এসব বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান আল মামুন
দেশ রূপান্তর : জামিয়া কাশিফুল উলুম প্রতিষ্ঠার পেছনের আপনার ভাবনা কি ছিল?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ : আমি দীর্ঘদিন ধরে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা, সিলেবাস ও পাঠ্যক্রম নিয়ে কাজ করছি। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মেধা ও সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাদের সেই সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য শিক্ষার পরিসর আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
সেই চিন্তা থেকেই রাজধানীর মাতুয়াইলের তুষারধারায় ‘জামিয়া কাশিফুল উলুম ঢাকা’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিই। আমরা এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চেয়েছি, যেখানে একজন শিক্ষার্থী কোরআন-হাদিস ও দরসে নেজামির গভীর জ্ঞান অর্জন করবে। আবার বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাধারণ শিক্ষা ও বাস্তবজীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতাও অর্জন করবে। আলহামদুলিল্লাহ, অল্প সময়ের মধ্যেই জামিয়ার এই ব্যতিক্রমী চিন্তা ও শিক্ষা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
দেশ রূপান্তর : আপনার এই সমন্বিত চিন্তা ও শিক্ষার ঐতিহাসিক ভিত্তি কোথায়?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ : আমরা আসলে নতুন কিছু আবিষ্কার করছি না, বরং ইসলামি শিক্ষার একটি বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের দিকে ফিরে যেতে চাইছি। ইসলামের সোনালি যুগের শিক্ষাব্যবস্থা এমনই ছিল। দরসে নেজামির শিক্ষাব্যবস্থা মূলত এমনি ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তানের দারুল উলুম করাচিতে মুফতি মুহাম্মদ তকি ওসমানির চিন্তা ও শিক্ষার ধারায় দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা, মাদ্রাসার সঙ্গে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। ভারতে মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)-এর নেতৃত্বে দারুল উলুম নদওয়াতুল ওলামাতেও ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ের চেষ্টা হয়েছে। এর শিক্ষা দর্শন ও পাঠ্যক্রমের আলোকে জামিয়া কাশিফুল উলুম ঢাকার পথ চলা।
দেশ রূপান্তর : আপনি বলতে চাচ্ছেন, আধুনিক শিক্ষা যুক্ত করাটা আপনাদের নতুনত্ব নয়, বরং এটি দরসে নেজামির মূল দর্শনেরই অংশ?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ : ঠিক তাই। দরসে নেজামির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীকে একটি বিস্তৃত জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে পরিচিত করা। জ্ঞান-বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, গণিত, ইলমুত তিব্ব বা চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন শাস্ত্র মুসলিমদের জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যের অংশ ছিল।
সময়ের প্রবাহে আমাদের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেই বিস্তৃত জ্ঞানচর্চার জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে দরসে নেজামির মূল ব্যাপ্তির পরিবর্তে এর কিছু নির্বাচিত দ্বীনি অংশই অনেক ক্ষেত্রে প্রধান হয়ে উঠেছে।
আমরা মনে করি, দরসে নেজামির মূল শিক্ষা দর্শনের ব্যাপ্তি ও প্রাণশক্তির দিকে আবার ফিরে যেতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য দ্বীনি শিক্ষাকে কমিয়ে দেওয়া নয়, বরং দ্বীনি শিক্ষার ভিতকে আরও শক্তিশালী করে তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান যুক্ত করা। অনেক মাদ্রাসায় এগুলো হচ্ছে, কিন্তু আমল-আখলাক ও আমলি পরিবেশ বিনষ্ট হয়ে গেছে। আমরা এর সমন্বয় করতে চাই।
দেশ রূপান্তর : এই চিন্তার সঙ্গে ইসলামের সোনালি যুগের কী সম্পর্ক দেখেন?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ : ইসলামের সোনালি যুগে ‘আলেম’ ও ‘বিজ্ঞানী’, এভাবে জ্ঞানকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে দেখা হতো না। একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মীয় বিদ্যায় জ্ঞানী এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক শাস্ত্রের গবেষক হতে পারতেন। ইবনে সিনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে, আল-বিরুনি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূগোলে, আল-খাওয়ারেজমি গণিতে, ইবনে হাইসাম আলোকবিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানে, ইবনে নাফিস চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবং আল-জাজারি প্রকৌশল ও যন্ত্রবিদ্যায় অসাধারণ অবদান রেখেছেন।
আমাদের স্বপ্ন হলো, আবার এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন আলেম একই সঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষক হতে পারবেন। আমরা চাই, আগামী দিনের একজন আলেম শুধু মসজিদের ইমাম বা মাদ্রাসার শিক্ষক হবেন না, তিনি একই সঙ্গে বিশে^র শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক কিংবা চিন্তাবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন। আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক কম্পিউটার ল্যাবের পাশাপাশি সায়েন্সল্যাব, ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ক্লাব গড়ে তোলেছি। তারা আরবিতে যেমন দক্ষ তেমনি ইংরজিতেও দক্ষ। পাশাপাশি বিজ্ঞান বিভাগে সবাই পড়ালেখা করছে।
দেশ রূপান্তর : ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাকে কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছেন?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ : বর্তমান পৃথিবীতে শুধু ধর্মীয় জ্ঞান বা শুধু সাধারণ জ্ঞান, কোনোটিই এককভাবে যথেষ্ট নয়। আমাদের এমন মানুষ দরকার, যারা দ্বীন বোঝেন এবং একই সঙ্গে পৃথিবীকেও বোঝেন। একজন মুসলিম শিক্ষার্থীকে যদি আমরা কোরআন-হাদিস শেখাই, কিন্তু তাকে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, প্রশাসন, চিকিৎসা, প্রকৌশল কিংবা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ রাখি, তাহলে সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
আমরা চাই, আমাদের শিক্ষার্থীরা দ্বীনের জ্ঞান সঙ্গে নিয়ে সমাজের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিচরণ করুক।
দেশ রূপান্তর : সেই লক্ষ্যেই আপনার জামিয়ায় স্কুল ও কলেজ বিভাগ চালু করা হয়েছে?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ : হ্যাঁ। আমাদের স্কুল ও কলেজ বিভাগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা কওমি মাদ্রাসার পড়াশোনার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান শিক্ষার ওপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। চলতি বছর আমাদের শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাস করেছে। তবে আমাদের লক্ষ্য শুধু এসএসসি ও এইচএসসি পাস করানো নয়। আমরা চাই, একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসনসহ যেকোনো ক্ষেত্রে যেতে চায় যাক, কিন্তু তার দ্বীনি পরিচয় ও আলেম হওয়ার ভিত্তিটিও যেন টিকে থাকে।
দেশ রূপান্তর : আপনি বললেন, একজন আলেম ভবিষ্যতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বিসিএস ক্যাডারও হতে পারবেন। বিষয়টি একটু বিস্তারিত বলবেন?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ : আমরা মনে করি, যতদিন পর্যন্ত আলেম-ওলামারা মসজিদ-মাদ্রাসার পাশাপাশি সমাজের মূলধারার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে নেতৃত্ব না দেবেন, ততদিন সমাজের কাক্সিক্ষত পরিবর্তন পূর্ণাঙ্গভাবে সম্ভব হবে না।
ব্যবসা-বাণিজ্য, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, শিক্ষা, গবেষণা, গণমাধ্যম, প্রযুক্তিসহ সব ক্ষেত্রেই যোগ্য ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। আমরা চাই, একজন আলেম যেন একই সঙ্গে ডাক্তার হতে পারেন, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেন, বিসিএস ক্যাডার হতে পারেন, উদ্যোক্তা হতে পারেন, গবেষক হতে পারেন। স্বপ্ন দেখি, একদিন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেবেন আলেমরা।
দেশ রূপান্তর : এরই মধ্যে কি আপনারা এমন কোনো উদাহরণ তৈরি করতে পেরেছেন?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ : আলহামদুলিল্লাহ, আমরা এর কিছু বাস্তব উদাহরণও দেখতে শুরু করেছি। আমাদের একজন শিক্ষার্থী হিফজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি আলেম হয়েছেন এবং বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অধ্যয়ন করছেন।
আমার কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ। কারণ একজন হাফেজ ও আলেম হয়েও সে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই, আগামী দিনে এমন উদাহরণ আরও তৈরি হোক।
দেশ রূপান্তর : আগামী দিনে জামিয়া কাশিফুল উলুমকে কোথায় দেখতে চান?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ : আমাদের ১০ বছরের একটি সুস্পষ্ট ভিশন আছে। আমরা চাই, আগামী ১০ বছরে কাশিফুল উলুমের শিক্ষার্থীরা দেশের মূলধারার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করুক। মসজিদ-মাদ্রাসায় দ্বীনি যেকোনো খেদমতের পাশাপাশি কেউ হবে আলেম ও চিকিৎসক, কেউ আলেম ও প্রকৌশলী, কেউ আলেম ও প্রশাসক, কেউ গবেষক, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ প্রযুক্তিবিদ। কেউ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোয় কাজ করবে, কেউ ব্যবসা ও করপোরেট জগতে নেতৃত্ব দেবে, কেউ শিক্ষা ও গবেষণায় অবদান রাখবে।
আমরা চাই, সমাজ যেন আগামী দিনে এমন আলেমদের দেখে, যারা শুধু মসজিদ-মাদ্রাসায় নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন, শিক্ষা, ব্যবসা ও সামাজিক নেতৃত্বেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।