ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রাজনৈতিক গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের স্মৃতি সংরক্ষণে ‘আর্তনাদ’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হয়েছে। নিপীড়নের সেই অন্ধকার অধ্যায় স্মরণে রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর ভয়াবহতা তুলে ধরার উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুর ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি চত্বরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘আর্তনাদ’ স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করা হয়।
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের নির্যাতনে নিহত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের শাহাদাতবার্ষিকীর দিনে স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করা হয়। শহীদ আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটির উদ্বোধন করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।
গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্মরণ ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে স্মৃতিস্তম্ভটি স্থাপন করা হয়েছে। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। ‘আর্তনাদ’ নামকরণ করেন ডাকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মহিউদ্দিন খান। স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ ও বাস্তবায়নের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ডাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইকবাল হায়দার।
স্থাপত্যটির নকশা করেছেন স্থপতি নাজমুল ও তাঁর দল। স্মারকটির শিরোনাম ‘আর্তনাদ—নীরব ক্রন্দন’। এর সঙ্গে লেখা রয়েছে, ‘যে কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়েছিল, স্থাপত্যে আজ সেই কণ্ঠই প্রতিধ্বনিত।’
স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ ও বাস্তবায়নে আরও তত্ত্বাবধান করেন ডাকসুর ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম এবং সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহ বলেন, ‘আমার ছেলে আবরার ফাহাদকে হারানোর কষ্ট একজন বাবা হিসেবে কখনোই ভুলতে পারব না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে সে তার নিজের মত প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সেই মত প্রকাশের কারণে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একজন বাবা হিসেবে সন্তানের এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন।’
তিনি বলেন, ‘আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আর্তনাদ’ নামে যে স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হলো, এটিকে আমি শুধু একটি স্থাপনা হিসেবে দেখছি না। এটি সেই সব শিক্ষার্থীর স্মৃতি বহন করবে, যারা বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাদের অনেকেই হয়তো নিজেদের কষ্টের কথা প্রকাশ করার সুযোগ পাননি। এই স্মৃতিস্তম্ভ তাদের সেই নীরব কষ্টের কথাও বলবে।’
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে যে গণরুম-গেস্টরুমের অপসংস্কৃতি চালু ছিল, এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চালানো হতো। অসংখ্য শিক্ষার্থী এর কারণে নির্যাতিত, অপমানিত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। অনেকের জীবনও ঝরে গেছে।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সেই কষ্ট, ভয় ও আর্তনাদকে স্মরণে রাখতেই ‘আর্তনাদ’ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভ ‘আর্তনাদ’ সেই নিপীড়নের ইতিহাসকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে করিয়ে দেবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দেবে।’
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস ইবনে মুনিরসহ হল সংসদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
যেভাবে প্রতীকায়িত হয়েছে নিপীড়নের স্মৃতি
স্মারকটির নকশা ও ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে প্রচলিত রাজনৈতিক গেস্টরুম সংস্কৃতির মাধ্যমে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের স্মারক হিসেবে এটি পরিকল্পিত। বিভিন্ন নথিভুক্ত বর্ণনায় গেস্টরুমকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে বাধ্য করা, মৌখিক নির্যাতন ও শারীরিক সহিংসতার স্থানে পরিণত হওয়ার কথা উঠে এসেছে।
স্থাপত্যটির আকৃতি একটি উঁচু, একখণ্ড ত্রিভুজাকার উল্লম্ব স্ল্যাবের মতো। নকশাকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে গেস্টরুমের আবদ্ধ দেয়াল ও সংকুচিত পরিসরকে প্রতীকায়িত করা হয়েছে। যে স্থানটির মূল অর্থ আতিথেয়তা ও আশ্রয়, বহু শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতায় সেই স্থানই ভয়, চাপ ও জবরদস্তির পরিসরে পরিণত হয়েছিল।
স্মারকটির কালো ঊর্ধ্বমুখী ভর প্রতীকায়িত করছে অন্ধকার, গোপনীয়তা এবং বন্ধ দরজার ভেতরের মানসিক চাপকে। ওই অন্ধকার ভরের নিচের অংশ থেকে উঠে এসেছে একাধিক উজ্জ্বল সাদা মানবহাত। এগুলোকে প্রতিরোধ, আকুতি ও মুক্তির প্রচেষ্টার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। হাতগুলো নিপীড়নের শিকার অসংখ্য জুনিয়র শিক্ষার্থীর সম্মিলিত অথচ স্তব্ধ কণ্ঠকে প্রতিনিধিত্ব করছে।
এতে থাকা কালো হাতগুলো প্রতীকায়িত করছে ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক পরিচয় ও আধিপত্যকে। নকশার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সেই আধিপত্যের আড়ালে সিনিয়ররা নির্যাতনের আয়োজন করত এবং সেটিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করত।
স্মারকটির পৃষ্ঠে খোদাই করা হয়েছে বিভিন্ন শব্দ, বিচ্ছিন্ন বাক্য ও খণ্ডিত সংলাপ। নকশাকারদের মতে, এসব শিলালিপিতে নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত সময়, নির্দেশ, প্রশ্ন, হুমকি ও কথোপকথনের অংশবিশেষ ধারণ করা হয়েছে। প্রচলিত কোনো ঐতিহাসিক কালানুক্রম অনুসরণ না করে খণ্ডিত শব্দ ও বাক্যের মাধ্যমে গেস্টরুমের সেই আবহ তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে শব্দই ভয় দেখানো ও নিয়ন্ত্রণের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।
ধারণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের চর্চার বর্ণনায় গভীর রাতের বিভিন্ন সেশনের উল্লেখ রয়েছে। এসব সময়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ডেকে নেওয়া হতো এবং সিনিয়রদের রাজনৈতিক নির্দেশনা অনুসরণে ব্যর্থ হলে তাদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো।
স্থাপত্যটির কালো থেকে সাদায় তীব্র রূপান্তরকে নিপীড়নের অন্ধকার থেকে সত্য, প্রকাশ ও স্মৃতির দিকে যাত্রার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্ধকার ভেদ করে উঠে আসা হাত ও খোদাইকৃত শব্দগুলো ধীরে ধীরে কণ্ঠে রূপান্তরিত হওয়ার বার্তা বহন করছে।