টাঙ্গাইলের সখীপুরে সম্পত্তি নিয়ে লন্ডনপ্রবাসী চিকিৎসক ছেলের সঙ্গে বিরোধের জেরে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া বৃদ্ধ বাবা-মা নিজেদের বাড়িতে ফিরেছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খানের হস্তক্ষেপে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় তাঁদের সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফটকে অবস্থিত বাসায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় ছেলের পাঠানো এক লাখ টাকা তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
মন্ত্রী জানান, বাবা-মায়ের ভরণপোষণের জন্য ছেলে প্রতি মাসে এক লাখ টাকা করে পাঠাবেন।
বৃদ্ধ দম্পতি আব্দুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের ছেলে লন্ডনপ্রবাসী ক্যানসার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. শাহ জালাল। সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. শাহ জালাল দাবি করেছেন, বাবা-মায়ের সম্মতিতেই ইসলামী ফারায়েজ অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন করা হয়েছে। এ নিয়ে করা মামলা আদালতে বিচারাধীন।
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে মন্ত্রী আহমেদ আযম খান ওই বাড়িতে গিয়ে বৃদ্ধ দম্পতির সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি মুঠোফোনে ডা. শাহ জালালের সঙ্গেও কথা বলেন। পরে ছেলের পাঠানো এক লাখ টাকা বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেন এবং তাঁদের বাড়িতে ফিরিয়ে দেন। টাকা হাতে পেয়ে আব্দুর রহমান ও আনোয়ারা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেখানে আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এ সময় সখীপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল আলম, সহকারী পুলিশ সুপার (সখীপুর সার্কেল) মামুনুর রশিদ, সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুরাদ হোসেন, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাজিম উদ্দিনসহ গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
জানা যায়, আব্দুর রহমান মিয়া সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক চিকিৎসা কর্মকর্তা। প্রায় চার দশক আগে তিনি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ২৪ শতাংশ জমি কিনে সেখানে তিনতলা ভবন নির্মাণ করেন। এ ছাড়া মির্জাপুর উপজেলার আজগানা ইউনিয়নের কড়িপাড়ার বদরচালা এলাকায় তাঁদের গ্রামের বাড়িতেও জমি রয়েছে।
আব্দুর রহমান ও আনোয়ারা বেগমের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে রোকসানা পারভীন ওরফে লিপি কানাডাপ্রবাসী। ছোট মেয়ে সুরাইয়া জেবিন (রিনা) সখীপুরে থেকে বাবা-মায়ের দেখাশোনা করতেন। একমাত্র ছেলে ডা. শাহ জালাল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে লন্ডনে থাকেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগে আব্দুর রহমান ডিমেনশিয়া ও কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার পর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। ডা. শাহ জালালের দাবি, তাঁর বড় বোনের স্বামী ডেসটিনির সাজাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ আলম চাপ প্রয়োগ করে মির্জাপুরের প্রায় ২০০ শতাংশ জমির মধ্যে ১০৭ শতাংশ লিখে নেন। এ ছাড়া বাবার অবসরের প্রায় ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কানাডা প্রবাসী শাহ আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডা. শাহ জালালের ভাষ্য, দেশে এসে বাবা-মায়ের সম্মতিতে সখীপুরের সম্পত্তি ইসলামী ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টনের উদ্যোগ নেন তিনি। সম্পত্তির একাংশ ছোট বোনের নামে, মায়ের প্রাপ্য অংশ মায়ের নামে এবং অবশিষ্ট অংশ নিজের নামে হেবা দলিল করা হয়।
তবে আনোয়ারা বেগমের অভিযোগ, তিনি স্বেচ্ছায় এসব দলিল করেননি। তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে বাড়ি ছেড়ে যেতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। দলিল বাতিল চেয়ে তিনি আদালতে মামলা করেছেন। এ ছাড়া মারধরের অভিযোগে টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ডা. শাহ জালাল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দলিল নিবন্ধনের প্রক্রিয়া প্রায় ১০ দিন ধরে চলে। এ সময় তাঁর মা উপস্থিত ছিলেন, নামজারি করেছেন এবং দলিলে সাক্ষী হিসেবেও স্বাক্ষর করেছেন। দলিল করার সময় তাঁর মা কোনো আপত্তি জানাননি বলে দাবি করেন তিনি।
বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন ডা. শাহ জালাল। তাঁর ভাষ্য, তিনি লন্ডনে ফিরে যাওয়ার ১২ দিন পর বাবা-মা নিজেরাই বাড়ি ছেড়ে মির্জাপুরে চলে যান।
সখীপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মাহমুদা আক্তার বলেন, দলিল নিবন্ধনের সময় জোরজবরদস্তির কোনো ঘটনা তাঁর নজরে আসেনি। নিয়ম মেনেই একই সময়ে তিনটি দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি আনোয়ারা বেগমের নামেও রয়েছে। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতই দেবেন।
ওই ভবনের এক ভাড়াটিয়া ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা ফরিদ হোসেন বলেন, তিনি কোনো ঝগড়া বা মারধরের ঘটনা শোনেননি। তবে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে জমি ও ভবন মাপজোখ করতে দেখেছেন।
অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা টাঙ্গাইল ডিবি পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রিয়াজ তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বৃদ্ধ দম্পতি আপাতত বাড়িতে ফিরলেও সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতা, দলিল বাতিলের দাবি এবং জোরজবরদস্তির অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি। এসব বিষয়ে আদালতে চলমান মামলার রায়ের ওপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে।
সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল আলম বলেন, মন্ত্রী মহোদয়ের পরামর্শে বৃদ্ধ দম্পতিকে মির্জাপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে সখীপুরস্থ নিজের বাড়িতে সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে লন্ডন প্রবাসী চিকিৎসক ছেলের বিরোধের আপাতত নিষ্পত্তি হয়েছে।