রেমিট্যান্সের ডলারে ঘুরছে অর্থনীতি

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২১ এএম

দেশে রেমিট্যান্সের অর্থাৎ প্রবাস-আয়ের প্রবাহে লক্ষণীয় গতি এসেছে। গত আগস্ট মাসে প্রবাস-আয় এসেছে ২৯৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। জুলাইয়ে এসেছে প্রায় ২৮৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের ১৯১ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের তুলনায় প্রায় ৪৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আগস্ট শেষে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। প্রশ্ন হচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যাংকে আসার পর কোথায় যাচ্ছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেমিট্যান্সের ডলার ব্যাংকে অলস পড়ে থাকে না। এর বড় অংশই আমদানির দায় পরিশোধে ব্যয়িত হয়ে থাকে। আর আরেক অংশ যায় আন্তঃব্যাংক বাজারে। আবার বাজারে সরবরাহ বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কিনে সঞ্চিতি (রিজার্ভ) বাড়ায়; আবার ডলারের চাহিদা বেড়ে গেলে রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহ করে। অর্থাৎ রেমিট্যান্সের ডলার হারিয়ে যায় না, বৈদেশিক লেনদেন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পথ ঘুরে আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসে। এ কারণে রেমিট্যান্স বাড়ার পাশাপাশি আমদানি-ব্যয় বাড়লেও রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশের আমদানি-বিল বেড়ে হয়েছে ৬৪৪ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। জ্বালানি পণ্যের আমদানিই হয়েছে ১৩৭ কোটি ডলারের, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। জুলাইয়ে রপ্তানি-আয় কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, আয় নেমেছে ৪৩৫ কোটি ডলারে। ফলে রেমিট্যান্সের বাড়তি ডলার আসার পরও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে নতুন করে চাহিদা তৈরি হচ্ছে।

বৈদেশিক ও নীতি বিভাগ নিয়ে কাজ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ‘ডলার ব্যাংকে ঢুকছে, আবার এলসি পরিশোধের সময় বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রবাস-আয় বৈধ চ্যানেলে দেশে এলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে টাকায় রূপান্তরিত হয়ে প্রাপকের কাছে যায়। কিন্তু ব্যাংকের হিসাবে এর বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ তৈরি হয়।’ 

ব্যাংকগুলো এই ডলার নিজেদের বৈদেশিক দায় মেটাতে ব্যবহার করতে পারে। কোনো আমদানিকারকের এলসি পরিশোধের প্রয়োজন হলে ব্যাংক সেই ডলার ব্যবহার করে বিদেশি সরবরাহকারীর পাওনা পরিশোধ করে। এভাবে রেমিট্যান্সের ডলার সরাসরি দেশের আমদানি ব্যয়ের অর্থায়নে চলে যায়। আবার কোনো ব্যাংকের কাছে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ডলার থাকলে তা অন্য ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে পারে। এভাবেই আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের লেনদেন হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি তুলনামূলকভাবে দৃঢ়তর হওয়ায় তারা রেমিট্যান্সের ডলার বেশি দামে কিনতে আগ্রহ দেখায়নি। আগস্টে কিছু ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার নেট উন্মুক্ত অবস্থান (এনওপি) সীমার কাছাকাছি চলে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ার কথাও ব্যাংকাররা জানিয়েছেন।

রেমিট্যান্স ও রপ্তানি-আয়ের কারণে বাজারে যখন ডলারের সরবরাহ বাড়ে ও চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম থাকে তখন বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কিনে নেয়। সম্প্রতি এমন ঘটনাও ঘটেছে। ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক চারটি ব্যাংক থেকে ৫ কোটি ডলার কিনেছে। প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ২০ মে ডলার কেনার পর প্রায় তিন মাসের বিরতি দিয়েছিল। এর ফলে ব্যাংকের অতিরিক্ত ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে চলে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তথ্যও বলছে, রেমিট্যান্স-প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার মাধ্যমে রিজার্ভে ধারাবাহিক উন্নতি হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি মোট রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল, যা এক বছর আগে একই সময়ে ছিল ২৯ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। তবে ডলারের বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু কেনে এমন নয়। চাহিদা বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রিও করে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে ছয়টি ব্যাংকের কাছে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলার বেচেছে ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সা দরে। এর আগে টানা ১৪ মাস বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার বেচেনি। বরং ওই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৬০০ কোটি ডলার কিনেছিল।

এর থেকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়, রেমিট্যান্স ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনে আর আমদানি-দায় ও অন্যান্য বৈদেশিক পরিশোধের চাহিদা বেড়ে গেলে বাজারে ডলার বিক্রি করে দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ৩৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে। জুলাই শেষে ছিল ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন এবং আগস্ট শেষে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স, রপ্তানি-আয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাজার থেকে ডলার কেনার ফলে রিজার্ভের দৃঢ় পুনর্গঠন হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আগের তুলনায় বেশি সুযোগ দিয়েছে। তাই বাজারে যখন সরবরাহ বাড়ছে তখন ডলার কেনা হচ্ছে; আবার বিনিময় হারে বাড়তি চাপ তৈরি হলে ডলার বেচে দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেমিট্যান্স যতটা বাড়ছে, ততটা রিজার্ভে যুক্ত হচ্ছে না। কারণ রেমিট্যান্সের অর্থ দিয়ে একই সঙ্গে আমদানি-বিল ও অন্যান্য বৈদেশিক দায় পরিশোধ করা হচ্ছে। রেমিট্যান্সের একটি অংশ বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি পূরণ করছে, আর উদ্বৃত্ত অংশের একাংশ রিজার্ভে যুক্ত হচ্ছে।

অর্থনীতি-বিশ্লেষক মাজেদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো ডলার ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে যুক্ত হয় এবং এর মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দৃঢ় হয়। রিজার্ভ বাড়লে আমদানি-দায় মেটানো, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়ে। দেশের আর্থিক সক্ষমতা বাড়লে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম বাড়ে।

তার মতে, বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর সঙ্গে রেমিট্যান্সের অর্থ যদি দেশের উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হয় তাহলে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ার পাশাপাশি আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। প্রবাস-আয়ের প্রবাহ শুধু রিজার্ভ বাড়াবে না, অর্থনীতির ভিত শক্ত করার কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক চিত্রে বড় পরিবর্তন আসবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত