ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের স্ত্রী শামসুন নাহার একজন গৃহিণী। নিজের কোনো দৃশ্যমান আয় না থাকলেও তার নামে রয়েছে বাড়ি, গাড়ি, এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র। বিভিন্ন ব্যাংকে নিজের নামে, সন্তান ও নিকটাত্মীয়দের নামে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র থাকার তথ্যও পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ছেলে তাকে সঞ্চয়পত্র কিনে দিয়েছেন বলে তিনি নিজের আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেছেন। প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের ঘুষ, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধান করতে গিয়ে তার স্ত্রী শামসুন নাহারের সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসে। অভিযোগের ভিত্তিতে এসব সম্পদের উৎস ও অর্জনের বৈধতা যাচাই করছে দুদক।
অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার ২ বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এখনো শেষ হয়নি তা; কবে শেষ হবে নিশ্চিত নন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। দুদক ও দুদকের বাইরে বিভিন্ন ধরনের তদবিরের কারণে অনুসন্ধান দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ডিপিডিসির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। অভিযোগটির অনুসন্ধান করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, তার স্ত্রী শামসুন নাহার এবং তাদের তিন সন্তান নাভিল হোসেন তামীম, ফারিহা হোসেন মুমু ও তাজফিকুর হোসেন তানজিফের নামে থাকা সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর ব্যাংক, বীমা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সিটি করপোরেশন, ভূমি অফিস, রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষসহ (রাজউক) প্রায় ৭০টি সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে চিঠি দিয়ে তথ্য চান অনুসন্ধান কর্মকর্তা। চিঠিতে বলা হয়েছে ডিপিডিসির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ও তার গৃহিণী স্ত্রী শামসুন নাহার অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে থাকা রেকর্ডপত্র ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে দুদকে পাঠাতে অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে তাদের তিন সন্তানের নামে কোনো সম্পদ থাকলে তার তথ্যও চাওয়া হয়।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে বেলায়েত হোসেন চাকরিজীবনে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ি ও গাড়ির মালিক হয়েছেন। রাজধানীর ধানম-ির ৩/এ রোডের ৫৬ নম্বর ভবনে ১ হাজার ৮০০ বর্গফুট আয়তনের দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে তার। ফ্ল্যাট দুটির নম্বর ৩/এ/২ ও ৩/বি। আয়কর রিটার্নে এসব ফ্ল্যাটের মূল্য দেখানো হয়েছে ৯৪ লাখ ১৮ হাজার ৬০ টাকা। তবে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ফ্ল্যাট দুটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ঢাকার উলন মৌজায় ৮২৫ অযুতাংশের অর্ধেক অর্থাৎ ৪১২ দশমিক ৫ অযুতাংশ জমির মূল্য আয়কর নথিতে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। ওই জমির বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। একই মৌজায় আরও ২ দশমিক ৮ কাঠা জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা। ওই জমির প্রকৃত বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
ঢাকার আফতাব নগরে বেলায়েত হোসেনের ৫ কাঠা ও ১০ কাঠা আয়তনের দুটি প্লট রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার ডেমরা, আশুলিয়া ও গাজীপুরে নিকট আত্মীয়-স্বজনের নামে জমি কেনার অভিযোগও রয়েছে। তার নামে ব্যাংকে এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র থাকার তথ্যও রয়েছে। তার ব্যক্তিগত গাড়ির নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ-২৬-৫৪৮৩।
অভিযোগে বলা হয়েছে বেলায়েত হোসেন চাকরিজীবনে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন এবং সে সুযোগে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হন। আয়কর রিটার্নে উল্লেখ না করা সম্পদও তার রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
নিজের আয় নেই, তবু স্ত্রীর নামে বাড়ি গাড়ি
প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের স্ত্রী শামসুন নাহার নিজেকে গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তার নিজস্ব আয় না থাকলেও তার নামে রয়েছে বাড়ি, গাড়ি, এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র। শামসুন নাহারের নামে রাজধানীর ৪৪/এ হাজীপাড়ায় একটি টিনশেড বাড়ি রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। তার নামে একটি ব্যক্তিগত গাড়িও রয়েছে। গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ-১৯-৪৮৩৮। অভিযোগ অনুযায়ী, গাড়িটি তার আমেরিকাপ্রবাসী চাচা ইয়াকুব আলী শরিফের ছেলে রুবায়েত শরিফের নামে নিবন্ধিত হলেও সেটি ব্যবহার করেন শামসুন নাহার। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে শামসুন নাহারের নিজের নামে, তার সন্তান ও নিকট আত্মীয়দের নামে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে নিজের আয় না থাকা সত্ত্বেও ছেলে তার নামে সঞ্চয়পত্র কিনে দিয়েছেন, এমন তথ্য শামসুন নাহার তার আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেছেন। ফলে তার নামে থাকা এসব সম্পদ ও বিনিয়োগের অর্থের উৎস কী এবং তা বৈধ উপায়ে অর্জিত হয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের আওতায় নিয়েছে দুদক।
দুর্নীতির অনুসন্ধান শেষ হচ্ছে না
অভিযোগ অনুসন্ধানের এক বছর ৯ মাস পার হওয়ার পরও তা শেষ হয়নি, বরং অনুসন্ধান-কর্মকর্তা এখনো বিভিন্ন নথি সংগ্রহ ও সম্পদের প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ের কথা বলছেন। অনুসন্ধান-কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, ডিপিডিসির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। অভিযোগসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তার সম্পদের যে মূল্য দলিল বা রেকর্ডপত্রে দেখানো হয়েছে, প্রকৃত মূল্য তার চেয়ে বেশি বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রকৃত মূল্য জানতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে আরও চিঠি দিতে হবে। তিনি বলেন, এসব তথ্য পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হবে। তবে অনুসন্ধান শেষ হতে কত সময় লাগবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
জানা গেছে, অনুসন্ধানের গতি কমে যাওয়ার পেছনে নানা ধরনের তদবিরের প্রভাব রয়েছে কি না, সেটিও আলোচনায় রয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে নিজের আয় না থাকা একজন গৃহিণীর নামে কোটি টাকার বাড়ি, গাড়ি, এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রের উৎস কী? স্বামীর আয় ও সম্পদের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি? আর অভিযোগে উল্লিখিত সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্যই বা কত? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে দুদকের অনুসন্ধান শেষ হলে।