উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে কুয়াকাটা

সড়ক, ড্রেনেজ, নিরাপদ পানি সরবরাহ থেকে শুরু করে খাল পুনঃখনন ও সৌন্দর্যবর্ধন—বিভিন্ন খাতে চলছে উন্নয়নকাজ। তবে পর্যটননগরীকে আরও আকর্ষণীয় করতে প্রয়োজন রাতের নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো।

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৫ এএম

সমুদ্রের নীল জলরাশি, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপার সৌন্দর্য, রাখাইন সংস্কৃতি, লেম্বুর বন এবং কচ্ছপখালী খাল—সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। দিন দিন বাড়ছে এই পর্যটননগরীতে ভ্রমণপিপাসু মানুষের আগ্রহ। পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে নাগরিকসেবার চাহিদাও। এ পরিস্থিতিতে কুয়াকাটা পৌরসভায় প্রায় ২০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে।

সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপদ পানি সরবরাহ, সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, খাল পুনঃখনন, ফুটপাত তৈরি এবং শহরের সৌন্দর্যবর্ধনসহ বিভিন্ন খাতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে একাধিক প্রকল্প। সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হলে কুয়াকাটার অবকাঠামো ও নাগরিকসেবায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। তবে পর্যটননগরীকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও রাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, বর্তমানে পৌরসভায় বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় উন্নয়নকাজ চলছে। এর মধ্যে উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্পের আওতায় ১২০ কোটি টাকা, ইউআইআইপি কুয়েত প্রকল্পে ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, টেকসই নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ২৫ কোটি টাকা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৪৮ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ রয়েছে। এসব প্রকল্পের কিছু কাজ বাস্তবায়নাধীন, অন্যগুলোর কাজ চলছে দরপত্র ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্পের আওতায় কুয়াকাটার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামো উন্নয়ন করা হচ্ছে। পরিবেশগত প্রশমন কার্যক্রমে ব্যয় হচ্ছে ১৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। ইউনিব্লক দিয়ে প্রায় পৌনে চার কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছে। রাখাইন পল্লি কেরানীপাড়ার অভ্যন্তরে ৪৮৫ মিটার আরসিসি সড়ক ও ড্রেন নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে দেড় কোটি টাকা। এ ছাড়া ৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪ কিলোমিটার ২৪৫ মিটার সড়কে বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে।

পৌর এলাকায় দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতেও নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ। পাঞ্জুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনতলাবিশিষ্ট সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ২৮ লাখ ৩ হাজার ৬৭৩ টাকা। অন্যদিকে মীরাবাড়ি মাদ্রাসায় তিনতলা সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫ কোটি ৩৭ লাখ ১১ হাজার ৫৩৯ টাকা।

এ ছাড়া প্রায় ৮০০ মিটার সড়ক আরসিসি দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। ৩ কিলোমিটার ৭১০ মিটার আরসিসি ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। তিনটি আরসিসি আর্চ ব্রিজ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৪ লাখ ৮২ হাজার টাকা। পাশাপাশি দুটি আবাসন এলাকায় ৫৮৮ মিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৮০ লাখ টাকা।

কুয়াকাটার অন্যতম প্রাকৃতিক আকর্ষণ কচ্ছপখালী খালকে ঘিরেও রয়েছে সৌন্দর্যবর্ধনের বড় পরিকল্পনা। পৌরসভার প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক জানান, খালটির উন্নয়ন প্রকল্প ইতোমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পৌরশহরের প্রাণ হিসেবে পরিচিত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি পুনঃখনন, পাড় সংরক্ষণ, হাঁটার পথ নির্মাণ, বেঞ্চ ও ঘাটলা স্থাপন, প্যাডল বোট সরবরাহ এবং বৃক্ষরোপণসহ সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

খালটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রসৈকতের বাইরেও পর্যটকদের বিনোদনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এদিকে পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে লতাচাপলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের খাস পুকুরের চারপাশে হাঁটার পথ ও ঘাটলা নির্মাণসহ সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৬৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা। পশ্চিম কুয়াকাটায় ডিবিএল ল্যান্ড-সংলগ্ন খাসজমিতে শিশুপার্ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি টাকা।

দোভাষীপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত সড়কে এবং সমুদ্রবাড়ি রিসোর্ট থেকে নীলাঞ্জনা সড়ক পর্যন্ত ড্রেনের ওপর প্রশস্ত ফুটপাত নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৪২ লাখ ১০ হাজার টাকা। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শহরের সৌন্দর্য বাড়ার পাশাপাশি পর্যটকদের চলাচল আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পর্যটননগরী কুয়াকাটার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপদ পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এ খাতে অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। কুয়াকাটা পৌরসভায় নিরাপদ পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর আটটি পরীক্ষামূলক নলকূপ নির্মাণ করছে। এতে ব্যয় হচ্ছে ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা।

এ ছাড়া চারটি উৎপাদক নলকূপ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৯৭ লাখ ৭৬ হাজার ২৯২ টাকা এবং চারটি পাম্প হাউস নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৯৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৬ টাকা। আট কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪৭ হাজার ২০ টাকা। এ কাজও চলমান রয়েছে। পাশাপাশি এক হাজার বাড়িতে পানির সংযোগ দিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।

অন্যদিকে একটি ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার, পানির উঁচু ট্যাংক, দুই কিলোমিটার সঞ্চালন পাইপলাইন এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পৌরবাসীর পাশাপাশি পর্যটকদের জন্যও নিরাপদ পানি সরবরাহ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে।

কুয়াকাটা হোটেল, মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন, প্রায় ২০০ কোটি টাকার চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কুয়াকাটার অবকাঠামোতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে পর্যটননগরীর ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য শুধু সড়ক ও ড্রেনেজ নির্মাণ যথেষ্ট নয়। পর্যটকদের বিনোদন, হাঁটার উপযোগী পরিবেশ, রাতের নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

কুয়াকাটা উন্নয়ন ফোরামের অন্যতম সদস্য ও কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, কুয়াকাটায় একটি দৃষ্টিনন্দন ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা যেতে পারে। পৌরসভা বাসস্ট্যান্ড থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে হাঁটার পথ তৈরি, বৃক্ষরোপণ এবং দৃষ্টিনন্দন সড়কবাতি স্থাপন করা প্রয়োজন। এতে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও আকর্ষণীয় হাঁটার পরিবেশ তৈরি হবে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশকর্মী আসাদুজ্জামান বলেন, জিরো পয়েন্ট চৌরাস্তা থেকে লেম্বুর বনাঞ্চল-সংলগ্ন সৈকত পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়ক সৌরবিদ্যুৎচালিত বাতির মাধ্যমে আলোকিত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ জন্য অন্তত এক মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পৌরসভার সড়কগুলোতে সৌরবাতি স্থাপন করা হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি রাতের কুয়াকাটার সৌন্দর্যও বাড়বে।

পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, কুয়াকাটাকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রে উন্নীত করতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। কুয়াকাটা পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত করার কাজ চলছে। এ ছাড়া আধুনিক মানের ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণের জন্য চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে কুয়াকাটার পর্যটন বিকাশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, নাগরিকসেবা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা জরুরি। চলমান প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় ওয়াচ টাওয়ার, হাঁটার পথ, সৌরবিদ্যুৎ, পর্যটকবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে কুয়াকাটাকে আরও আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও পর্যটকবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত