শরতের আবহে বগুড়ায় শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগর ও আয়োজকরা।
এ বছর জেলার ১২ থানায় ৭৩০টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে, এরমধ্যে অর্ধেকের বেশি পূজামণ্ডপ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা পুলিশ। উৎসব নির্বিঘ্ন করতে মণ্ডপের গুরুত্ব বিবেচনায় সিসিটিভিসহ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে জেলা পুলিশ।
এদিকে পূজামণ্ডপগুলোতে থাকছে বিশেষ আয়োজন। উত্তরবঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্গা প্রতিমা যা ১৯ ফুট নির্মাণ করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন আয়োজকরা।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৭৩০টি মণ্ডপের মধ্যে ১০৬টি অতি গুরুত্বপূর্ণ, ৩২৯টি গুরুত্বপূর্ণ, ১২টি কম গুরুত্বপূর্ণ এবং ২৮৩টি সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়া সদর থানায় সর্বোচ্চ ১২১টি মণ্ডপ রয়েছে। এ ছাড়া শেরপুরে ৯৪টি, গাবতলীতে ৮৪টি, আদমদীঘিতে ৬৯টি, শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলায় ৬৪টি, সোনাতলায় ৫৩টি, শাজাহানপুর ও নন্দীগ্রামে ৪৮টি করে, দুপচাঁচিয়ায় ৪৫টি, কাহালুতে ৪২টি, ধুনটে ৩৪টি এবং সারিয়াকান্দিতে ২৮টি মণ্ডপ রয়েছে।
পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বগুড়ায় ৬৮০টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে হিসাবে এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ৫০টি। উৎসবকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন মণ্ডপে এখন বিরাজ করছে সাজসাজ রব।
জানা যায়, শনিবার (১০ অক্টোবর) মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। পঞ্জিকা অনুযায়ী, আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুর্গোৎসব। এরই মধ্যে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন শিল্পীরা। কোথাও প্রতিমায় মাটির শেষ প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও চলছে রং ও অলংকরণের কাজ।
বগুড়া শহরের উত্তর চেলোপাড়ার বিশ্বকর্মা প্রতিমা তৈরির কারখানার স্বত্বাধিকারী কাজল চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, এ বছর বগুড়া সদর ও আশপাশের উপজেলা ছাড়াও জামালপুর ও নওগাঁ থেকে ২০টি প্রতিমার সেট তৈরির অর্ডার পেয়েছেন। গত বছরের তুলনায় অর্ডার কমেছে। প্রতিটি প্রতিমার সেট ২৫ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকায় তৈরি করা হচ্ছে।
বগুড়া মহানগরের সবচেয়ে বেশি জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় ডালপট্টি সার্বজনীন পূজামণ্ডপে। গতবারের তুলনায় আরও বেশি আকর্ষণ থাকবে দর্শনার্থীদের জন্য বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। প্রায় অর্ধকিলোমিটার এলাকাজুড়ে থাকছে আলোকসজ্জা। সবমিলিয়ে এবারের পূজায় এখানে ব্যয় হবে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। ইতিমধ্যে তাদের প্রতিমা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন চলছে আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জার কাজ।
ডালপট্টি সার্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটি সাধারণ সম্পাদক সুজিত জয়সোয়াল বলেন, শিল্পীর তার হাত দিয়ে দুর্গাপূজাকে সাজিয়ে তোলার কাজে ব্যস্ত। আমরা প্রতিবছর উত্তরবঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে সেরা আয়োজন করে থাকি। এবার তাই হবে। সারাদেশের মধ্যে আমরা অন্যতম তালিকায় থাকবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে বগুড়া মহানগরের চেলোপাড়া এলাকায় দুর্জয় ক্লাবে তৈরি করা হচ্ছে। গতবছর এখানে ১৬ ফুট উচ্চতার দুর্গা নির্মাণ করা হয়েছিল। এবার করা হচ্ছে ১৯ ফুট উচ্চতার প্রতিমা। নান্দনিক সাজে সাজিয়ে তুলতে খুব জোড়েসোরে কাজ করতে দেখা যায় কর্মীদের।
দুর্জয় ক্লাবের সভাপতি পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করা হচ্ছে। নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তুলতে কাজ করছেন শিল্পীরা। সবাইকে পূজা দেখার আমন্ত্রণ রইল।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি পরিমল চন্দ্র দাস বলেন, ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পূজার প্রস্তুতি চলছে। মণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংগঠনের পক্ষ থেকেও মণ্ডপে নিরাপত্তাকর্মী রাখা হবে।
বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মিডিয়া মুখপাত্র আতোয়ার রহমান জানান, বগুড়ার সকল পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। পুলিশের পাশাপাশি পূজামণ্ডপগুলোতে আনসার সদস্য, স্বেচ্ছাসেবক, সাদাপোশাকধারী সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়াও পূজা চলাকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে আইনশৃংখলা বাহীনির সদস্যদের টহল টিম। সনাতন ধর্মালম্বীরা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের উৎসব পালন করতে পারে সেজন্য সকল প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।