মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে চলতে থাকা যুদ্ধ পারস্য উপসাগরের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অবশেষে সত্য হলো। টানা আট মাস চলতে থাকা এ যুদ্ধের কারণে জ¦ালানি তেল, গ্যাস ও সারসহ বিভিন্ন পণ্যের বৈশি^ক সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ায় ভুগছে দেশের মানুষ, শিল্প ও অর্থনীতি। এই সংকট মোচনের কোনো ইঙ্গিত মিলছে না। এরই মধ্যে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থক হুতিরা লোহিত সাগরের বাব-আল-মান্দেব প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নিয়েই সৌদি আরবে হামলা শুরু করায় বাংলাদেশের জন্য সংকট আরও তীব্র হতে শুরু করেছে। বিদেশে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার বড় রকম ঝুঁকিতে পড়েছে।
সৌদির আকাশ যোগাযোগব্যবস্থা অচল করতে হুতিরা রিয়াদ ও দাম্মামসহ কয়েকটি বিমানবন্দরে হামলা তীব্রতর করায় বাংলাদেশ থেকে কয়েক দিন ধরে ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। এতে কমপক্ষে ১৫ হাজার কর্মী দেশে আটকা পড়েছেন; যাদের বেশিরভাগ ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। অনেকে প্রথমবার কাজে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। এয়ারলাইনসগুলো ‘যাত্রীদের নিরাপত্তার’ কারণ দেখিয়ে আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে দাম্মাম ও রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে। হুতি হামলা তীব্রতর ও ব্যাপক হলে ফ্লাইট বাতিল হওয়া অব্যাহত থাকবে না, এটা জোর দিয়ে বলা যায় না। ফ্লাইট স্থগিত ও বাতিল হওয়া অব্যাহত থাকলে কর্মীদের অনেকের কাজে যোগদানের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। এমনকি, পুরনো কর্মীরা ছাঁটাইও হতে পারেন। এতে বহু পরিবারের প্রবাসী আয় বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা মনে করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে দ্রুত বিদেশগামী কর্মীদের পাশে সমন্বিতভাবে দাঁড়াতে হবে।
বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বহু বছর ধরে কাঠামোগত সংকটে ভুগছে। আমরা মনে করি, সৌদি আরবের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সংকট কাটাতে স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণ এই দ্বিমুখী সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে।
একক বৃহত্তম বাজার হিসেবে সৌদি আরবে কর্মী যাওয়া কমলে দেশে প্রবাসী আয় আসা কমে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। সংকট তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে যেসব কর্মীর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, তাদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা সরকার বলছে। আমরা মনে করি, আকাশপথে সৌদি আরবে যাতায়াত প্রতিষ্ঠা করা না গেলে জরুরিভিত্তিতে যেতে হবে, এমন কর্মীদের উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য পাঁচটি দেশে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন উড়োজাহাজে নিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে সৌদি আরবে নিজ নিজ কর্মস্থলে পাঠানো যেতে পারে। একই সঙ্গে কাজে যোগদানে অপ্রত্যাশিত বিলম্বের জন্য কর্মীরা যাতে চাকরি ও দেশটিতে আইনি মর্যাদা না হারান, সে জন্য নিয়োগকর্তাদের কাছে সৌদি সরকারি কর্তৃপক্ষ থেকে নির্দেশনা যাওয়া দরকার। পরবর্তী সময় যখনই আবার যাওয়ার সময় হবে, তখন কর্মীদের যাতে কোনো অবস্থাতেই অতিরিক্ত টাকা দিতে না হয়, সে ব্যবস্থাও করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দিক থেকে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ওপর অত্যধিক নির্ভর করায়ও ঝুঁকি আছে। বিদেশে অদক্ষ কর্মী পাঠানোও দেশের জন্য আর্থিক দিক থেকে বেশ ক্ষতিকর। তাই সংখ্যা বাড়াতে অদক্ষ কর্মী পাঠানোর পরিবর্তে মাঝারি মানের দক্ষতা ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী তৈরি প্রয়োজন। যারা বিদেশ থেকে কোনো কারণে আকস্মিক আসেন, তাদের নতুন করে পেশাগত দক্ষতা অর্জনে (রিস্কিলিং) সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। বিশেষায়িত কর্মীদের একটি বড় সংগ্রহ থাকলে কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রমবাজার ভূরাজনৈতিক বা অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে অস্থিরতার মুখে পড়লে পারিবারিক ও রাষ্ট্র-পর্যায়ে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়া সহজ হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ভবিষ্যতে প্রশমিত হলে ওই অঞ্চলের দেশগুলো যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে মনোযোগী হতে পারে। তখন অগ্রাধিকারভিত্তিতে বাংলাদেশের কর্র্মীদের যাতে নিয়োগ দেওয়া হয়, সে বিষয়ে দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন। এ ছাড়া বৈধভাবে অভিবাসনে যেতেও দক্ষকর্মীদের উৎসাহিত করা দরকার। দক্ষকর্মী পাঠানোর আলাপে অনেক সময় কেবল ইউরোপের কয়েকটি দেশ, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের মতো নিরাপদ ও কম প্রচলিত গন্তব্যের কথা বলা হয়। পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রচলিত শ্রমবাজারেও দক্ষ কর্মী যাওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা দরকার।
আমাদের আশা, সরকার এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।