দুর্গাপূজার থিম ‘জলজ’, জল ও জীবনের মহাজাগতিক বন্দনা

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৭ পিএম

জল, জীবন ও সৃষ্টির মহাজাগতিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এবারের শারদীয় দুর্গাপূজার থিম ‘জলজ’ নির্ধারণ করেছে গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন। ‘জল থেকে যার জন্ম’-এই ভাবনাকে উপজীব্য করে সাজানো হচ্ছে পূজামণ্ডপ। ধর্মীয় বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও পরিবেশ সুরক্ষার বার্তা তুলে ধরাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত জল। আধুনিক বিজ্ঞান যেমন জীবনের সূচনার সঙ্গে জলের সম্পর্ক তুলে ধরেছে, তেমনি বৈদিক ঋষিরাও জলকে সৃষ্টির আদি তত্ত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে সৃষ্টির পূর্বাবস্থার বর্ণনায় অন্ধকারে আচ্ছন্ন অসীম জলরাশির কথা বলা হয়েছে। সনাতন ধর্মের পঞ্চমহাভূতের অন্যতম ‘অপ’ বা জলকে প্রাণসঞ্চারের মূল উপাদান হিসেবে দেখা হয়।

নদী, বৃষ্টি, পুকুর, বিল ও সমুদ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাংলার জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে জলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেই চিরন্তন সম্পর্ককেই এবারের দুর্গাপূজার ভাবনায় ধারণ করেছে গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন।

সনাতন ধর্মে জল কেবল প্রাকৃতিক উপাদান নয়, এটি পবিত্রতা, পরমেশ্বর ও সংস্কারের প্রতীক। মাতৃগর্ভ থেকে শুরু করে জীবনের শেষ অঞ্জলি পর্যন্ত মানুষের জীবনচক্রের সঙ্গে জলের নিবিড় যোগ রয়েছে। ঘটস্থাপন, তর্পণ, হোম ও আত্মশুদ্ধিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচারেও জল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবীকে ‘তৃষ্ণারূপেণ সংস্থিতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জলের বুক চিরে যেমন পদ্ম প্রস্ফুটিত হয়, তেমনি জীবনের গভীর আকাঙ্ক্ষা থেকে মহাশক্তি মা দুর্গার আবির্ভাবের ভাবনাও তুলে ধরা হবে ‘জলজ’ থিমে।

এই মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক ভাবনাকে মণ্ডপসজ্জায় ফুটিয়ে তুলতে নির্মাণ করা হচ্ছে বৃহৎ ‘জলজ জৈব-রূপকল্প’। বাঁশ, বেত, প্রাকৃতিক তন্তু ও চটের মতো পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে তৈরি হবে ঢেউখেলানো বহুস্তরীয় দৃশ্যপট। স্থির হয়ে যাওয়া বিশাল জলতরঙ্গের আদলে তৈরি এই সজ্জা দর্শনার্থীদের ঘিরে রাখবে।

মণ্ডপের প্রবেশপথ থেকে অভ্যন্তর পর্যন্ত দর্শনার্থীদের যাত্রাকে সাজানো হবে একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হিসেবে। প্রকৃতির উত্তাল তরঙ্গ পেরিয়ে শান্তির মধ্য দিয়ে মাতৃচরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি করতে থাকবে জলপ্রপাত, রিফ্লেকশন পুল ও আলোর সমন্বয়। মণ্ডপের কেন্দ্রে থাকবে পদ্মের আদলে নির্মিত বৃহৎ স্থাপত্য। সেখান থেকে জলের গভীরতা ভেদ করে প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো উদ্ভাসিত হবেন আদ্যাশক্তি মা দুর্গা।

‘জলজ’ থিমের আবেদন ধর্মীয় অনুভূতির গণ্ডি ছাড়িয়ে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তাও বহন করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও জলদূষণের কারণে জলচক্রের সংকটের বিষয়টি এতে তুলে ধরা হয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য জলসম্পদ রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জলকে সম্মান করা ও সংরক্ষণ করার অর্থ জীবন, ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা।
এই থিমের মাধ্যমে ভয়ের পরিবর্তে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, মায়ের কাছে ফিরে যাওয়া এবং জীবমণ্ডল রক্ষার আনন্দময় আহ্বান জানানো হয়েছে।

জল, পদ্ম, তীর্থবারি, তৃষ্ণা ও জীবনের চিরন্তন সম্পর্ককে ধারণ করে দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা-বিশ্বসংসারকে তৃষ্ণামুক্ত করা, জীবন ও প্রকৃতিকে রক্ষা করা এবং মানুষকে সংহারের পরিবর্তে সৃষ্টির শক্তি দান করা।

বনানী কামাল আতাতুর্ক পার্কে গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই শারদোৎসবে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
জলজ-এক আনন্দময় শারদোৎসব ১৪৩৩।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত