আশাবাদী হওয়ার যুক্তি আছে কিন্তু ...

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৭ এএম

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার যুক্তি আছে। অবকাঠামো সম্প্রসারিত হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিসর  বেড়েছে, বহু মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। কিন্তু উন্নয়ন চিত্রের পাশে, ভিন্ন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা কাটছে না, সামান্য অর্থনৈতিক ধাক্কায় বহু পরিবার দারিদ্র্যের মুখে পড়ছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা, এখন শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। প্রশ্ন হলো, এই প্রবৃদ্ধির সুফল কারা পাচ্ছেন আর কারা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছেন? 

বলা দরকার, চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমতে পারে, অন্যদিকে বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। প্রশ্ন দাঁড়ায় অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে কি চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে? আইএমএফের এই বার্তা আমলে রাখা দরকার। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে দেখা যাচ্ছে, ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রোটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ প্রতিবেদন এ প্রশ্নকে আরও জরুরি করে তুলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২১.৪ শতাংশে বেড়েছে। ২০২৬ অর্থবছরে তা ২২.৫ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, অতি দারিদ্র্যের হার ৫.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০.১ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও যদি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে, কাজের সুযোগ সংকুচিত হয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে পরিবারকে ঋণ করতে হয়, তাহলে উন্নয়নের সুফল কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংক ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.৪ শতাংশ করেছে। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের দুর্বলতা, জ¦ালানি সরবরাহ সমস্যা এবং আর্থিক খাতের অস্থিরতা যুক্ত হয়েছে। এসব সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে, সীমিত আয়ের মানুষের ওপর। চাল, ডাল, তেল, মাছ, সবজি, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয় বাড়লেও তাদের আয় সমহারে বাড়ে না। ফলে সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে খাবারের মান কমানো, চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা সন্তানের শিক্ষার খরচ কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অর্থনীতির ভাষায় এগুলোকে ‘ভোগব্যয়ের সমন্বয়’ বলা যেতে পারে। কিন্তু একটি পরিবার বা খানায় এর অর্থ আরও কঠিন। অপুষ্টি, চিকিৎসার ঘাটতি, শিক্ষা ব্যাঘাত এবং ঋণের বোঝা ভবিষ্যতে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার পথ সংকুচিত করে। ফলে দারিদ্র্য শুধু বর্তমান আয়ের সমস্যা থাকে না; তা পরবর্তী প্রজন্মের সুযোগকেও সীমিত করে দেয়। এখানেই বাংলাদেশের উন্নয়ননীতির একটি মৌলিক দুর্বলতা সামনে আসে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রায়ই উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। অথচ প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, তার ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় না। একটি অর্থনীতিতে উৎপাদন বাড়তে পারে, কিন্তু সেই উৎপাদনের সুফল যদি সীমিত জনগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে না। বৈষম্যের চিত্রও উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আয়বৈষম্য পরিমাপের গিনি সহগ ৩৪.৯-এ পৌঁছানোর তথ্য এসেছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছেন, যেখানে অসুস্থতা, কর্মহীনতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো আকস্মিক ধাক্কা তাদের দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। অর্থাৎ দারিদ্র্যের বাইরে থাকা মানেই অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ থাকা নয়। এই বাস্তবতা সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বাংলাদেশে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নানা ভাতা, সহায়তা ও ভর্তুকি কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দরিদ্র মানুষের প্রায় ৬২ শতাংশই প্রধান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতার বাইরে। এত বড় জনগোষ্ঠী সহায়তার বাইরে থাকলে কর্মসূচির সংখ্যা কিংবা বরাদ্দের পরিমাণ দিয়ে সাফল্য দাবি করা কঠিন। সমস্যাটি শুধু অর্থাভাব নয়; বরং বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার, উপকারভোগী নির্বাচন এবং কর্মসূচির সমন্বয়ের সঙ্গেও সম্পর্কিত। সরকারি সহায়তা প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, একই পরিবার একাধিক সুবিধা পাচ্ছে কি না, কিংবা যোগ্য মানুষ তথ্যগত বা প্রশাসনিক জটিলতায় বাদ পড়ছেন কি না এসব বিষয়ে নিয়মিত নিরীক্ষা প্রয়োজন। সামাজিক নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ।

ভর্তুকির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বিদ্যুৎ ভর্তুকির সুবিধার প্রায় ৩৩ শতাংশ সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের কাছে যায়, অথচ দরিদ্রতম ২০ শতাংশ পরিবার পায় মাত্র ১৫.৪ শতাংশ। অর্থাৎ সবার জন্য একই হারে সুবিধা দেওয়ার নীতি সব সময় সবচেয়ে দরিদ্র মানুষকে বেশি সহায়তা করে না। বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী সচ্ছল পরিবার তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারে। তবে ভর্তুকি সংস্কারের অর্থ দরিদ্র মানুষের ওপর নতুন ব্যয়ের বোঝা চাপানো হতে পারে না। বিদ্যুৎ ও জ¦ালানির মূল্য বাড়লে, উৎপাদন ব্যয় থেকে শুরু করে পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম পর্যন্ত প্রভাবিত হতে পারে।

ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের আগে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। লক্ষ্য হওয়া উচিত অকার্যকর সুবিধা কমিয়ে সহায়তাকে আরও ন্যায্য করা, সামাজিক ব্যয় সংকুচিত করা নয়। এজন্য সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে, দেশের রাজস্ব আহরণ জিডিপির ৮.৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সীমিত রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের চাহিদা পূরণ কঠিন। কর ফাঁকি কমানো, অপ্রয়োজনীয় কর-সুবিধা পর্যালোচনা এবং করব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। রাজস্ব বাড়ানোর নামে শুধু সাধারণ ভোক্তার ওপর পরোক্ষ করের বোঝা চাপালে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। দারিদ্র্য মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কর্মসংস্থান বলতে কেবল কাজের সংখ্যা বোঝালে চলবে না। কাজটি কতটা স্থায়ী, আয় দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটে কি না এবং কর্মী সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পান কি না, এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। অনানুষ্ঠানিক খাতের স্বল্প মজুরির অনিশ্চিত কাজ অনেক মানুষকে কোনোভাবে টিকিয়ে রাখে, কিন্তু দারিদ্র্য থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করে না। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, নারীদের নিরাপদ কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ জোরদার করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো পরিবার সাময়িক সংকটে পড়লেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা পুষ্টির মতো মৌলিক প্রয়োজন থেকে বঞ্চিত না হয়। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা নয়, প্রবৃদ্ধির সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী করা। ব্যাংকিং খাত, জ¦ালানি, বিনিয়োগ ও রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন, কিন্তু সেই সংস্কারের সাফল্য বিচার করতে হবে মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন দিয়ে। দারিদ্র্য কমছে কি না, প্রকৃত আয় বাড়ছে কি না, কর্মসংস্থান নিরাপদ হচ্ছে কি না এবং সরকারি সহায়তা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, এসব সূচককে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির পূর্বাভাস এবং কোটি কোটি মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান দেখিয়ে দিচ্ছে, অতীতের অর্জন নিজে থেকে টিকে থাকবে না। উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে, সেই অর্জন রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। যে অর্থনীতি তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিককে সামান্য ধাক্কা থেকে রক্ষা করতে পারে না, তার প্রবৃদ্ধি যতই আশাব্যঞ্জক হোক, সামাজিকভাবে তা ভঙ্গুর থেকে যায়।

অতএব, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিতর্কে এখন অগ্রাধিকার বদলানো প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধি অবশ্যই দরকার, কিন্তু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য মানুষের জীবনমানের উন্নতি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। উন্নয়নের প্রকৃত পরীক্ষা হলো একটি পরিবার নিয়মিত খাবার কিনতে পারছে কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে পারছে কি না, সন্তানকে শিক্ষিত করার সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ন্যূনতম নিশ্চয়তা অনুভব করছে কি না। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইতিবাচক না হলে, প্রবৃদ্ধির সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

লেখক : গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত