সাতক্ষীরায় শামীম হত্যা মামলার দুই আসামি গ্রেপ্তার

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২২ পিএম

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দলবদ্ধ পিটুনিতে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) হত্যা মামলার এজাহারনামীয় দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে দেবহাটা থানা পুলিশ।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ভোরে উপজেলার সুবর্ণাবাদ ও নাজিরের ঘের এলাকার পৃথক স্থান থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন, দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের মৃত মাহতাব উদ্দিন খানের ছেলে মোক্তার হোসেন খান (৫৩) এবং নাজিরের ঘের গ্রামের রহিম বক্স মোল্লার ছেলে আসাদুল ইসলাম মোল্যা (৪৬)।

দেবহাটা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এইচ এম শাহীনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল শুক্রবার ভোর সকালে সুবর্ণাবাদ এলাকা থেকে মোক্তার হোসেন খানকে গ্রেপ্তার করে। পরে একইদিন ভোর ৫টা ১০ মিনিটে আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর শুক্রবারই তাঁদের আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

গত ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় তাঁর ভাই আব্দুল জলিল সানা দেবহাটা থানায় এজাহার দিয়েছেন। এতে মামলার ঘটনার নেতৃত্বে থাকা ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয় অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করার অভিযোগ করা হয়েছে।

শামীমের ভাই আব্দুল জলিল সানা বলেন, ধর্ম অবমাননার অপবাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে তাঁর ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এ হত্যার ঘটনায় সঠিক তদন্ত পূর্বক আসামিদের গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির দাবি করেছেন।

দেবহাটা থানার অফিসার ইনচার্জ -ওসি এইচএম শাহীন বলেন, ঘটনার শুরু থেকে পুলিশ বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এজাহার দায়েরের পর আমরা অভিযান পরিচালনা করে ২ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যহত রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সাতক্ষীরা জেলা পর্ষদের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মুনির উদ্দিন বলেন, সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অজুহাতে ফেসবুক লাইভ ও পোস্টের মাধ্যমে উস্কানি ছড়িয়ে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটার পরও মূল প্ররোচনাকারী ফজলুল হজ আমিনী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে।

ফেসবুকে ভিডিও বার্তা দিয়ে উন্মত্ত জনতা জড়ো করা, হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নিয়ে দেয়ালে আছাড় মারা ও পিটিয়ে হত্যার মতো বর্বরোচিত অপরাধের দায় নিজ মুখে স্বীকার করার পরও তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার না করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা।

‘মব জাস্টিস’-এর মূল কারিগর ফজলুল হক আমিনী ও তার প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন অডিও-ভিডিও ও পোস্টের তথ্যানুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন ফজলুল হক আমিনী।

তিনি নিজেই বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে স্পষ্ট স্বীকার করেছেন যে, তিনি ফেসবুক লাইভ ও পোস্ট দিয়ে ‘তৌহিদী জনতা’কে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেন এবং উস্কানি ছড়িয়ে মানুষকে উত্তেজিত করেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ: অডিও বার্তায় প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করতে দেখা গেছে-প্রশাসন তাকে গ্রেপ্তার করলে করবে এবং এর পরিণামে তার জেল-জুলুম বা ফাঁসি হলেও কোনো পরোয়া নেই। এমন প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ও উস্কানির পরেও তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনি ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হওয়ায় সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

উস্কানিদাতার প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো নিয়ে সুশীল সমাজ ও নেটিজেনদের ক্ষোভ ফজলুল হক আমিনীর ফেসবুক পোস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ কড়া ভাষায় এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করছেন: নেটিজেনদের বড় একটি অংশ মন্তব্য করছেন যে, ফেসবুক লাইভ ও পোস্টের সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে যেখানে মূল উস্কানিদাতাকে প্রথম সুযোগেই গ্রেপ্তার করার কথা, সেখানে সে কীভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় ও বড় বড় কথা বলে?

আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) সাতক্ষীরা জেলা শাখার প্রধান সংগঠক মাধব দত্ত বলেন, এই ঘটনা রাষ্ট্রীয় ও আইনি কাঠামোর চরম ব্যর্থতা। একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতাল থেকে বের করে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো, আর যে লোক মাইকিং বা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে মব সৃষ্টি করল, সে এখনও আইনের আওতার বাইরে থাকা মানে দেশে ‘মব কালচার’কে প্রশ্রয় দেওয়া।

বড় ভাই আব্দুল জলিল জানান, সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরনের গালিগালাজ করেন মানসিক রোগাক্রান্ত ওয়াহিদুজ্জামান। এ সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ওই অডিওতে কটূক্তি সংক্রান্ত কথা রয়েছে দাবি করে দেবহাটার ফজলুল হক আমিনী ওয়াহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ফেসবুকে লাইভ করে জনতাকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান।

এরপর ক্ষুব্ধ জনতা ওয়াহিদুজ্জামানের বাড়ির গেট ভাঙচুর করে সুবর্ণাবাদ বাজারে নিয়ে মারধর করে। মঙ্গলবার রাতে ফজলুল হক আমিনীসহ বিক্ষুব্ধরা চিকিৎসাধীন শামীমকে চেম্বার থেকে বের করে গণপিটুনি দেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

এরপর ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি লোক সখীপুর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন ওয়াহিদুজ্জামানকে দেয়ালে আছাড় মারে এবং বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ফেলে রেখে চলে যায়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মব সৃষ্টির মাধ্যমে আইন হাতে তুলে নিয়ে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আব্দুল জলিল।

ছোট ভাই জেলা রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও সুবর্ণাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি তাহসিভ রহমান সাগর জানান, বুধবার রাতে এশার নামাজের পর শামীমের জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর দুটি ছেলে রয়েছে। বড় ছেলের বয়স ১২ বছর, ছোট ছেলের বয়স ৭ থেকে ৮ মাস। আজকে মামলা করবো।

তিনি বলেন, তারা এসব তৌহিদী জনতা নামের হামলাকারীদের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত। কথা বললে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। তা থেকে তাদের রক্ষা করার মতো কেউ নেই।

মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ জনগণের মতে, কোনো দেশে যদি ডিজিটাল মাধ্যমে উস্কানি দিয়ে মানুষ হত্যা করার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি এভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে পারে, তবে তা সমাজের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। উস্কানিদাতা ফজলুল হক আমিনীসহ এ ঘটনার মূল হোতাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আনলে আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখা কঠিন হবে। 

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত