উমার হাসি

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৮ এএম

দেখতে দেখতে পূজা চলে এলো। প্রতিমার রঙের কাজ প্রায় শেষ। সবাই ম-প সাজাতে ব্যস্ত। কাগজ কেটে ফুল বানাও, নকশা আঁকো, কাপড় লাগাও। এরপর লাইটের লোক আসবে। সাউন্ডের লোক আসবে। তাদের কত কাজ!

মা-পিসিরা ব্যস্ত রান্নাঘরে। নাড়ু বানাও, মোয়া বানাও। তিলের নাড়– হবে, ঢ্যাপের মোয়া হবে। কত লোক আসবে। প্রসাদ পাবে। পুরো বাড়ি আনন্দে ভরে উঠবে।

শুধু উমার মনে আনন্দ নেই। সকাল থেকে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। কারও সঙ্গে কথা বলছে না। কেউ জিজ্ঞেস করলে ‘কিছু হয়নি, যাও’ বলে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। রাগ হয়েছে এ তারই লক্ষণ। স্কুল বন্ধ। পূজার ছুটি। এ সময় উমার ঘরে চুপচাপ বসে থাকার কথা নয়। 

ছোট্কা ঘরে ঢুকে উমাকে দেখেই বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে। জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে গাল ফুলিয়ে বসে আছিস কেন?

মন খারাপ?’

উমা এড়িয়ে গেল। ফর্সা গোল মুখে রাজ্যের বিরক্তি। ছোট্কাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। হো হো করে হেসে উঠে বলল, ‘রাগলে না তোকে পাকা কাঁঠালের মতো দেখায়। পাকা কাঁঠাল কেমন, জানিস তো?’

উমার এবার ভীষণ রাগ হলো। রাগ ভাঙাতে ছোট্কা চেয়ার টেনে উমার পাশে বসল। নিচু গলায় বলল, ‘মা বকেছে?’

উমার এবার কান্না পেল। দুই চোখ টলমল। কাকা আদর করে আরও কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘আহা! কী হয়েছে আমাকে বল।’

কী করে কথাটা বলবে উমা বুঝে উঠতে পারে না। নন্দিতার পূজার জামা কেনা হয়ে গেছে। গতকাল সবাইকে দেখিয়েছে। রীতিকার জামাটাও সুন্দর হয়েছে। এখন শুধু ওর জুতা কেনা বাকি। অথচ উমার এখন পর্যন্ত কিছুই কেনা হলো না! সে কত কিছু ভেবে রেখেছে। মাকে বলেছেও সে কথা। কিন্তু মার ওই এক কথা ‘আচ্ছা বাবা, হবে, সব হবে। সময় তো আর ফুরিয়ে যায়নি।’

উমা একদিন, দুদিন অপেক্ষা করেও দেখেছে। আজ দুপুরে মাকে সে আরেকবার মনেও করিয়ে দিয়েছে। মা উল্টো ধমক দিয়ে বলেছেন, ‘বিরক্ত করো না তো! সারাদিন শুধু জামা, জামা আর জামা।’

এরপর থেকেই উমার মন খারাপ।

একবার ভেবেছে বাবার কাছে বলবে। কিন্তু বাবা এত ব্যস্ত যে বলার সুযোগই পায়নি। উমা আর কাউকে কিছু বলবে না। এমনকি ছোট্্কাকেও না। পূজার দিন সবচেয়ে পুরনো জামা পরবে। নতুন জামা কিনে দিলেও সে আর পরবে না। তখন বেশ হবে!

কিন্তু ছোট্কা নাছোড়বান্দা। উমাকে খুঁচিয়েই যাচ্ছে ‘কী হয়েছে বলবি না? ঠিক আছে, তুই থাক। এই আমি চললাম।’

ছোট্কা উঠে দাঁড়াতেই মা ঘরে ঢুকলেন। তারপর উমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অনেক হয়েছে। আর গাল ফুলিয়ে বসে থাকতে হবে না। বিকেলে কাকুর সঙ্গে গিয়ে জামা কিনে নিয়ে এসো। তোমার বাবার তো আর সময় হবে না!’

পূজার জামা কেনা হয়নি বলেই যে উমার মন খারাপ এ কথা সবাই জেনে গেল। এবার দাদু বাবাকে বকছে, ঠাকুমা মাকে বকছে। পূজার আনন্দ তো ছোটরাই করবে। অথচ তারই কিনা মন খারাপ!

বিকালে ছোট্কার সঙ্গে গিয়ে জামা কিনে আনার পর সবাই উমাকে ঘিরে ধরল। বাড়ির সবাই নতুন জামা দেখতে চায়। কিন্তু উমা কাউকে নতুন জামা দেখতে দেয় না।

নন্দিতাকেও না।

রীতিকাকেও না।

পূজার দিন নতুন জামা পরে সে বন্ধুদের তাক লাগিয়ে দিবে। সে জামা লুকিয়ে রাখে।

পূজার দিন সকালবেলা বন্ধুরা উমাদের বাসায় আসে। সবাই মিলে মন্ডপে ঠাকুর দেখতে যাবে। এ এক অন্যরকম আনন্দ। সবাই সেজেগুজে তৈরি হয়ে এসেছে। উমা বন্ধুদের বসিয়ে রেখে দ্রুত তৈরি হয়ে নেয়। বুক শেলফের আড়াল থেকে নতুন জামা বের করে। কেমন এক অদ্ভুত ঘ্রাণ লেগে আছে। সে খুব যতœ করে জামার ভাঁজ একটু একটু করে খুলতে থাকে।

এ কী!

হায়! হায়!

নতুন জামা জায়গায় জায়গায় এমন ছেঁড়া কেন?

উমা জামা ভালো করে উল্টেপাল্টে দেখে। না, এটাই তো সেই জামা। কিন্তু জামার এ অবস্থা করল কে? উমার হঠাৎ করে কান্না পায়। চিৎকার করে সে কাঁদতে থাকে। 

কান্না শুনে ছোট্কা দৌড়ে আসেন।

রান্নাঘর থেকে মা, ঠাকুমা আসেন।

নন্দিতা, রীতিকাও আসে।

ছোট্কা উমার জামা দেখে হেসেই অস্থির। হাসতে হাসতেই বলেন, ‘ঠিক হয়েছে! পূজার জামা কাউকে দেখাবে না তো, ইঁদুর মামা ঠিকই দেখে ফেলেছে।’

ঠাকুমা সন্তনা দেন, ‘কেঁদো না দিদিভাই। লক্ষ্মী সোনা। নতুন জামা আরেকটা কিনলেই হবে।’

উমার কানে তখন কারও কথাই ঢুকছে না। কোনো সান্ত¡নাতেই কান্না থামছে না। সে এক হুলস্থুল ব্যাপার! এমন সময় বাবার কণ্ঠ শোনা যায়। বাবার হাতে নতুন একটা প্যাকেট। মুচকি হেসে প্যাকেটটি তিনি উমার দিকে বাড়িয়ে দেন। তারপর উমাকে আদর করে কোলে নিয়ে বলেন, ‘ছিঃ মামণি, পূজার দিন কাঁদতে নেই। লোকে হাসবে যে! তুমি কী চাও তোমাকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করুক?’

বাবা উমার জন্য নতুন জামা আগেই কিনে এনে রেখেছিলেন। সারপ্রাইজ দেবেন বলে কাউকে বলেননি। ভাগ্যিস বাবা জামা কিনেছিলেন। নইলে ইঁদুরের কারণে উমার এবারের পূজার আনন্দটাই মাটি হয়ে যেত।

‘হতচ্ছাড়া দুষ্টু ইঁদুর।’ উমা বকা দেয়। তার হাসিও পায়। উমার হাসি দেখে সবার মুখে হাসি ফোটে। পূজার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাড়িতে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত