দুর্গোৎসবে সতর্ক সরকার ও বিএনপি

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১০ এএম

এবার বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। উৎসবের অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি, সরকারি ছুটি বাড়ানোসহ সার্বিক বিষয়ে সরকার সহযোগিতা করছে। এ ছাড়া সারা দেশে পূজা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়, সে বিষয়ে সতর্ক সরকারি দল বিএনপিও। ইতিমধ্যে দুর্র্র্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অ্যালার্ট রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে সার্বিক বিষয় তদারকি করছেন এবং মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের পূজাম-প পরিদর্শন করবেন। 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে এই ধর্মের অনুসারীরা বিএনপির পাশে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পূজাম-পে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী-এমপি-নেতারা নিজ নিজ এলাকার পূজামন্ডপে আর্থিক সহযোগিতা করছেন।’

দুর্গাপূজা উপলক্ষে গত শনিবার গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ করতে সবাইকে সরকার ও বিএনপিসতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তারেক রহমান। পর দিন রবিবার জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও একই ইস্যুতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যেন উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বিঘেœ দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারেন, সেজন্য প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষ অনুদান বাড়ানো হয়েছে। এ বছর পূজাম-পগুলোর জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে (২০ অক্টোবর মহানবমী ও ২২ অক্টোবর নির্বাহী আদেশে এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর সাধারণ ছুটি)। এর সঙ্গে শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে মোট ৫ দিনের (২০ থেকে ২৪ অক্টোবর) টানা ছুটি পাচ্ছেন সরকারি কর্মচারীরা।’ তিনি আরও জানান, পূজামন্ডপে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মোবাইল অ্যাপসহ আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পূজামন্ডপগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং জেনারেটর ও রিচার্জেবল লাইট সবসময় প্রস্তুত রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মন্ডপে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে ২৪ ঘণ্টা পাহারা নিশ্চিত করা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা কাছের থানায় জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখন দুর্গাপূজা নিয়ে ব্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সারা দেশে শান্তিপূর্ণভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় উৎসব দুর্গাপূজা পালন করতে পারে সেদিকে লক্ষ রাখছি।’

তিনি জানান, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে পূজাম-প পরিদর্শন করতে আগামী ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে আসবেন প্রধানমন্ত্রী। এ দিন সন্ধ্যা ৬টায় তিনি নগরের রহমতগঞ্জের জে এম সেন হল পূজামন্ডপ পরিদর্শন করবেন। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। এরপর সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে পৌঁছে বিরতি নেবেন। ওই রাতেই ঢাকায় ফিরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি শারদীয় দুর্গাপূজাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং এ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও মন্ত্রিসভায় বিশেষ আলোচনা হয়েছে। সবার আগে বাংলাদেশ, আর এই বাংলাদেশ মানে সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের উৎসবকে সবার উৎসব হিসেবে দেখা হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন যে, সরকার গঠনের পর এবারই প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন ও উদযাপনের বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি দেখভালের দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সহযোগিতা নিয়ে সরকার পাশে রয়েছে। স্থানীয় পূজা উদযাপন কমিটি এবং বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মিলেমিশে পূজামন্ডপগুলোর নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু আয়োজন নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।

এদিকে গতকাল শুক্রবার সকালে বান্দরবান জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিভিন্ন পূজাম-পে আর্থিক অনুদানের চেক বিতরণ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, ‘এবারের শারদীয় দুর্গাপূজা উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা করতে পারে। তাই গুজবে কান না দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সবার প্রতি আহ্বান জানাই।’

তিনি বলেন, ‘দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো নাশকতার আশঙ্কা নেই। তবু কেউ যেন কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটাতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।’ অনুষ্ঠানে সরকারের পক্ষ থেকে বান্দরবানের ৩৩টি পূজাম-পের জন্য ২৫ লাখ টাকার চেক তুলে দেন মন্ত্রী।

৬৯ লাখ টাকা অনুদান দিল ঢাকা জেলা পরিষদ : ঢাকা জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. ইয়াছিন ফেরদৌস মোরাদ দেশ রূপান্তরকে জানান, ঢাকা জেলা পরিষদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেলার ১ হাজার ১৮টি পূজামন্ডপে মোট ৬৯ লাখ ১০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৮৬৯টি পূজাম-পে ৪৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা এবং ঢাকা মহানগর এলাকার ১৪৯টি পূজাম-পে ২৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

অনুদান বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি পূজামন্ডপ পরিচালনা কমিটির হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার হয়েছে। মো. ইয়াছিন ফেরদৌস মোরাদ জানান, উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এবং ঢাকা মহানগর এলাকায় সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য, তাদের প্রতিনিধি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সুপারিশের ভিত্তিতে সরাসরি পূজামন্ডপ পরিচালনা কমিটির হাতে অনুদান পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর এলাকার যেসব পূজাম-প এ বছর অনুদানের আওতায় আসেনি, আগামীতে সেগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করার সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত